ঢাকা, ২২ সেপ্টেম্বর : নিজের বিরুদ্ধে আনা স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থার অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার শাসনামলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বৈরাচারী আচরণের কারণে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে -এমন অভিযোগকেও নাকচ করেছেন তিনি।

ঢাকায় দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দীর্ঘসময় ধরে দেশ শাসন করা সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কথিত ‘বলপূর্বক গুম’, বিরোধী দল ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সদস্যদের গণগ্রেপ্তার, গণমাধ্যম ও ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ওপর নতুন করে বসানো নিষেধাজ্ঞার বিষয়গুলোকে নাকচ করে দেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমার কাজ হলো মানুষকে সাহায্য করা। আমি সাধারণ মানুষের জন্য রাজনীতি করি, মানুষ এখন গণতন্ত্রকে উপভোগ করছে। মানুষ চায় তাদের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ হোক। তাই আমি মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে তাদের সহায়তা করছি। এর মধ্যে আছে খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কাজের সুযোগ এবং একটি উন্নত জীবন।

‘২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে এবং ২০৪১ সালে বাংলাদেশ বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ করছে এবং এতে সাধারণ মানুষ সন্তুষ্ট। মানুষ এসব উপভোগ করছে। তো আপনি যেভাবে বললেন যে আমি কর্তৃত্ব করছি, সেটা ঠিক নয়। আমি কর্তৃত্ব করছি না। আমি সাধারণ মানুষের সেবা করছি।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন। এই সময়ের মধ্যে জাতিসংঘের দারিদ্র্র্য বিমোচন কর্মসূচি ও উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় কাঙ্‌ক্িষত সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

নিরাপত্তা সংস্থা বিশেষত র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) অসাংবিধানিকভাবে  ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করছে- এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ হাসিনা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই পরিবর্তন কে এনেছে? আমি এনেছি। আমি এই দ্বার উন্মুক্ত করেছি। এখন আমাদের ৪১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আছে, সবমিলিয়ে সারা দেশে ৭০০টি সংবাদপত্র আছে। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে লিখছে এবং দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোও (এনজিও) নিয়ম ও আইন অনুযায়ী কাজ করছে।

শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বিএনপি যার কাছ থেকে ২০০৮ সালে তিনি ক্ষমতা বুঝে নেন তারা সবশেষ জাতীয় নির্বাচন বয়কট করে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছে। ফলে আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন ছোট ছোট দল নিয়ে গঠন করা জোট সহজেই নির্বাচনে জয় পেয়েছে। সেই সময় থেকেই নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপি ও তার বিতর্কিত ইসলামপন্থী মিত্র জামায়াতে ইসলামী সারা দেশে অবরোধ ও সহিংস বিক্ষোভ শুরু করে। যা এখন পর্যন্ত একটি নিষ্ফল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনার বাবা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা অধিগ্রহণ করা সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সে সময় পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যসহ নিহত হন শেখ মুজিবুর রহমান।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে তিনি খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেছিলেন। যেহেতু নির্বাচনে কারচুপি হবে বলে বিএনপি আশঙ্কা করছিল সে জন্য সে সময় খালেদা জিয়াকে অন্তবর্র্‌তী সরকারের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতেও প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য অনুযায়ী, তার প্রস্তাব রেগে নাকচ করে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া।

শেখ হাসিনা বলেন, এই নির্বাচনে অংশ না নেওয়াটা তার (খালেদা জিয়া) একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। এ সময় বিরোধী দল সন্ত্রাসবাদ ও বাংলাদেশজুড়ে খুনের রাজত্ব বিস্তার করতে চায় বলেও অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা।

প্রায় প্রতিদিনই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দায়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে জামায়াতে ইসলামীর সাবেক দুই সংসদ সদস্যসহ ১৩ জনকে ঢাকার একটি বাসা থেকে বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বলছে, এই ধরনের ঘটনা ভিত্তিহীন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে হয়রানির জন্যই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যার ঘটনায় জড়িতদের শাস্তির জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকেও সরকার নিজের স্বার্থে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করছে বিরোধী পক্ষগুলো। ২০০৯ সালে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে এরইমধ্যে বেশ কয়েকজন জামায়াত নেতা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান বলেন, সরকারের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ওপর থেকে বিশ্বাসকে নষ্ট করে দিচ্ছে এবং এর ফলে একটি প্রবল নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।

আতাউর রহমান বলেন, এখন এক ব্যক্তির শাসনের দিকে যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। ফলাফল হিসেবে আমরা গণতন্ত্রের শেষ কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাধীনতা হারিয়েছে। এমনকি সিভিল সার্ভিসের আমলাতন্ত্রেরও কোনো স্বাধীনতা নেই।

‘নাগরিক সমাজের সদস্যরাও চাপের মধ্যে আছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীরাও আছেন চাপে। এখন নিজেকে পাহারা দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে। আপনি চিৎকার করতে পারবেন তবে এতে নিজেরই বিপদ ডেকে আনবেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও (এনজিও) ব্যাপকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।’ বলেন আতাউর রহমান।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় শেখ হাসিনাকে সমর্থন করে। শীর্ষ পর্যায়ের সব কর্মকর্তাই তাঁর নিয়োগ দেওয়া। বিরাট বড় অঙ্কের বাজেট দিয়ে এবং বেতন বাড়িয়ে সামরিক বাহিনীকে কিনে নেওয়া হয়েছে। এর এখন ব্যাংক, হোটেল, আবাসন ব্যবসা, শিল্প কারখানা এমনকি ট্যাঙির মালিকানাও আছে। এ ছাড়া জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে কাজ করার লোভনীয় সুযোগও আছে। বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী এখন বিশ্বের এক নম্বর শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সদস্য পাঠানো দেশ। এ ছাড়া সেনা সদস্যদের তুষ্ট করতে নতুন নতুন অস্ত্র কিনছেন শেখ হাসিনা।’

তাই কিছু সময়ের জন্য আওয়ামী লীগের অন্তত সেনা অভ্যুত্থান মোকাবিলা করতে হবে না বলেও মনে করেন সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তা। তবে ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীর মধ্য ও নিম্ন পর্যায়ে থাকা রক্ষণশীল কর্মকর্তারা যে প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না বলেও মত দেন তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটা চূড়ান্ত অবস্থা আসতে যাচ্ছে। সেই সময়টা কখন আসবে তা কেউ জানে না। তবে যখনই আসুক তখনই খুব বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। এটা বাংলাদেশ বা আন্তর্জাতিক অঙ্গন কারো জন্যই সুখকর হবে না।

ঢাকার সর্বাধিক বিক্রিত ইংরেজি ভাষার পত্রিকা দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, ‘বাংলাদেশ একটি নজিরবিহীন পরিস্থতির মুখোমুখি, যেখানে সংবাদমাধ্যম কখনই পুরোপুরি স্বাধীন ছিল না, তা এখন কর্তৃপক্ষের দ্বারা বেশ হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বহুল আলোচিত ইন্টারনেট ও সমপ্রচার আইনের কথা বলেন, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতি অশ্রদ্ধামূলক কোনোকিছু প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর সাথে তিনি সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার এবং সরকারবিরোধী টেলিভিশন চ্যানেল ও সরাসরি টিভি টকশোগুলোকে টার্গেট করার কথাও বলেন। তার মতে, সংবাদমাধ্যম এখন মারাত্মক অস্বাভাবিক পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে, যেটা প্রায়ই সেলফ সেন্সরশিপে পরিণত হচ্ছে।

মাহফুজ আনাম বলেন, সরকার তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাস্ত করেছে। এখন সংবাদমাধ্যমের সমালোচনার দিকে নজর দিয়েছে, কারণ আমরা স্বাধীন। দুর্নীতি ও গণতান্ত্রিক নীতিবোধের ব্যাপারে আমরা অত্যন্ত কঠোর। তারা কোনো ভিন্নমত কোনোভাবেই গ্রহণ করে না।

অন্য সমালোচকরা আঙুল তোলেন সমপ্রতি আনসারুল্লা বাংলা টিম নামের একটি জঙ্গি সংগঠনের দ্বারা নাস্তিক ব্লগার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার দিকে। পুলিশের মুখপাত্র একদিকে হামলার নিন্দা জানান, অন্যদিকে শেখ হাসিনার মন্ত্র জপেন, ৩ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যের পুনরোক্তি করেন যে, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে, এমন কোনো মন্তব্য সহ্য করা করা হবে না।

সংশয় থাকা সত্ত্বেও, অন্য সমালোচকদের মতো আনামও অসন্তোষ নিয়েই হাসিনার প্রশাসনের প্রশংসা করেছেন। যার ব্যাপারে তিনি (আনাম) বলেছেন, দীর্ঘ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংগ্রাম শেষে তিনি (শেখ হাসিনা) ক্ষমতার শীর্ষে অধিষ্ঠিত হয়েছেন।

প্রায় ছয় শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে জীবনযাত্রার মান বাড়ছে এবং তা অতীতের বিপর্যয়কর অবস্থার তুলনায় দৃঢ়। বেশির ভাগ বাংলাদেশি শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় চায়। নেলসন-বাংলাদেশের করা একটি সামপ্রতিক জরিপ তার পক্ষে ৬৭ শতাংশ রায় দিয়েছে।

তিনি তার বাবার হত্যাকারীদের ফাঁসি দিয়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরাভূত করেছেন, তিনি দেশে জনপ্রিয়, সেনাবাহিনী তার হাতে, উন্নয়নে আছে সাফল্যের গল্প এবং সংবিধান তাকে দিয়েছে অসীম ক্ষমতা।’ মাহফুজ আনাম বলেন।

ঢাকাভিত্তিক জাতিসংঘের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রবার্ট ওয়াটকিনস কোনো সমস্যা দেখছেন না। ‘আমার মনে হয় না হঠাৎ কোনো কিছু ঘটবে। অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, মানুষ ঢাকায় আসছে এবং কাজ পাচ্ছে, সরকার মানুষ খাওয়াচ্ছে, ব্যস্ত রাখছে। মানুষ গণতন্ত্রের ব্যাপারে কম সচেতনই থাকবে।

শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ, যিনি জয় নামে পরিচিত তিনি শেখ হাসিনার অবসরের পর আওয়ামী লীগের প্রধান হবেন- এটাই বহুল প্রত্যাশিত বিষয়।

কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে হাসিনার বাংলাদেশে কারো ক্ষমতা নেই চাপ প্রয়োগ করার। অল্প কিছু মানুষেরই সাহস আছে চাপ প্রয়োগের। স্বাভাবিকভাবে, হাসিনার শেষ শব্দ আছে, ‘আমাদের দেশে আমরা আপনাদের ওয়েস্টমিনিস্টার ধরনের গণতন্ত্র চর্চা করি। যত দিন মানুষ চাইবে তত দিন আমি থাকব। যদি তারা না চায়। ঠিক আছে। যদিও আমার ক্ষমতা থাকুক আর নাই থাকুক আমি মানুষের জন্য কাজ করে যাব এবং আমি এখনো তাই করছি।’

দ্য গার্ডিয়ান থেকে হুবহু অনূদিত। সূত্র : এনটিভি অনলাইন

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *