ঢাকা, ১৯ সেপ্টেম্বর : বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বর্তমানে লন্ডনে অবস্থান করছেন। সেখানে চোখ এবং পায়ের চিকিৎসা করাবেন তিনি। এ বছর ঈদুল আজহাও লন্ডনে উ‌দযাপন করবেন তিনি।

১৯৯১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর এই প্রথম তিনি দেশের বাইরে ঈদ করতে যাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, দীর্ঘ ৮ বছর পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদ করতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি লন্ডনে যাওয়ায় বিএনপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা আগেভাগেই লন্ডনে গিয়ে অবস্থান করছেন। আরও কয়েকজন সিনিয়র নেতারও লন্ডনে যাওয়ার কথা।

ঈদে লন্ডনে হতে পারে চেয়ারপারসনের পরিবার, প্রবাসী ও বিএনপির প্রভাবশালীদের মতবিনিময় সাক্ষাৎ। বৈঠক হতে পারে ব্রিটেনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও। হয়তো ব্যক্তিগত সফর রাজনৈতিক সফরেও রূপ নিতে পারে।

তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির সব পর্যায়ের নেতাকর্মী ও শুভাকাঙ্খীর দৃষ্টি এখন লন্ডনের দিকে।

বিএনপি সমর্থনকারীরা ভাবছেন, চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া হয়তো এই সফরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমর্থন পাবেন।

তাঁরা মনে করছেন, এটাই বিএনপির শেষ ভরসা। এবার সমর্থন না পেলে হয়তো সহজে আর সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই তৃণমূল নেতাকর্মীরা লন্ডন থেকে সুখবর আসার অপেক্ষায় রয়েছেন। দেশে থাকা সিনিয়র অনেক নেতাও তাকিয়ে আছেন লন্ডনের দিকে।

শুধু আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের বিষয়েই নয়; দল পুনর্গঠনের ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত আসে-  তা জানার অপেক্ষায় আছেন তাঁরা। লন্ডনের দিকে ত্যাগী নেতাদের আগ্রহ বেশি। কারণ দীর্ঘদিন ত্যাগীরা অবহেলিত ছিলেন। এবার বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দল পুনর্গঠনের ব্যাপারে মায়ের সঙ্গে যে আলোচনা করবেন, তাতে হয়তো ত্যাগীদের মূল্যায়নের বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এছাড়া তারেক রহমানের আরও অনেক সিদ্ধান্ত এবং দিকনির্দেশনার দিকে তাকিয়ে আছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

অপরদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে কোথায় থাকছেন, কি করছেন, কি খাচ্ছেন, কবে-কখন-কোথায় চিকিৎসা করাবেন, তাঁর কর্মসূচি কি কি আছে- এসব বিষয়েও অনেকের জানার আগ্রহ রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ সরকার ও লন্ডনে প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার থাকা-খাওয়া এবং কর্মসূচির বিষয়ে অনেকটা গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরকারের নজরদারিতে রয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসনের লন্ডন সফর। সরকারের পক্ষ থেকে মনে করা হচ্ছে, খালেদা জিয়া সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র করতে লন্ডনে গেছেন।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে লন্ডন যাননি। তিনি ষড়যন্ত্র করতে সেখানে গেছেন।’

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপিও গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া লন্ডন গেছেন দেশের এবং দেশের জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে।’

সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম রোববার লন্ডনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ছেন। লন্ডনে বিএনপির কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করতে এবং কোনো ষড়যন্ত্র হলে তা তাৎক্ষণিক কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, সে উদ্দেশ্য নিয়েই তাঁর এই সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুধু তিনি নন, খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের সময় সরকারের অন্তত এক ডজন প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ নেতা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কাজে দেশের বাইরে অবস্থান করবেন। সরকারি কাজে বিভিন্ন সেমিনারে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তাঁরা সেসব দেশের প্রতিনিধিকে অবহিত করবেন।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়া লন্ডনে বিভিন্ন বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধাচরণ করলে সঙ্গে সঙ্গে তার জবাব দেওয়ার প্রস্তুতিও রাখতে এসব নেতাকে দল ও সরকারের হাইকমান্ড থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

লন্ডন থেকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক সিনিয়র নেতা এ প্রতিবেদককে জানান, ‘প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা চেয়ারপারসনের সফরের খবর শুনেই আগে থেকেই বিক্ষোভ করার ঘোষণা দেন। তাঁরা বলেছেন, যেখানেই বিএনপি চেয়ারপারসন থাকবেন, সেখানে গিয়েই তাঁরা বিক্ষোভ করবেন। কিন্তু বিমানবন্দরে অল্প ক’জন লোক এসেছিলেন।

তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শেষবার লন্ডনে এসে প্রবাসীদের যে তোপের মুখে পড়েছিলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি। কারণ প্রবাসী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও এখন শান্তি চান।’

তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এই সিনিয়র নেতা আরও বলেন, ‘আপনারা ছবিতে হয়তো দেখেছেন তারেক রহমান তার মাকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে পাশে বসিয়ে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে নিয়ে যাচ্ছেন। তারেক রহমান ড্রাইভ না করে অন্য কাউকে দিয়ে ড্রাইভ করাতে বা অন্য কাউকে সঙ্গে নিতে পারতেন। কিন্তু তা করা হয়নি। কেন করা হয়নি? নিশ্চয়ই এর একটা কারণ আছে। গভীরভাবে চিন্তা করলে আপনারা অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন। তাছাড়া তাঁদের মুখের হাসিও অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। তবে শুধু এটুকুই আমি বলব, বিএনপির সুদিন আসতে আর বেশি সময় লাগবে না। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে সরকারের দমন-পীড়নে বিএনপি টিকতে পারেনি। কিন্তু এবার বিএনপি তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের আন্দোলনের ব্যাপারে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আর সে কারণেই বিএনপি চেয়ারপারসনের লন্ডন সফরে আসা।’

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কোথায় থাকেন- এমন প্রশ্নে বিএনপির এই সিনিয়র নেতা বলেন, ‘বুধবার বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তারেক রহমানের বাসায় যান। সেখান বিশ্রাম নেন। পরিবারের সবার সঙ্গে গল্প করেন। রাতের খাবার শেষে ১১টায় ইস্ট লন্ডনের বুকিং দিয়ে রাখা হোটেলে যান। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে আবার তারেক রহমানের বাসায় আসেন। সারাদিন পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে রাতে হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নেন। এদিন লন্ডন বিএনপির কয়েকজন নেতা তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় তাঁরা লন্ডনের কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন।’

চেয়ারপারসনের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘তারেক রহমানে স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান নিজেই চিকিৎসক। সে ক্ষেত্রে এ বিষয়টি তিনিই দেখভাল করবেন। পারিবারিকভাবে জোবাইদা রহমানের তত্ত্বাবধানে তো তিনি থাকবেনই। এছাড়া যদি অন্য কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন হয়, চোখ বা পায়ের- তা ডা. জোবাইদা রহমানই করবেন।’

ব্রিটেনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের ব্যাপারে ওই প্রবাসী নেতা বলেন, ‘ঈদের আগেও বৈঠক হতে পারে। তাছাড়া প্রবাসীদের নিয়ে একটি সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে ম্যাডামের। তার দিনক্ষণ এখনও ঠিক হয়নি। তবে তা আগে থেকে জানিয়েই করা হবে।’

একটি সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক এবং পারিবারিক দুটি বিষয়েই মা-ছেলের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। তিন মাসের অবরুদ্ধ থাকা দিনগুলো নিয়ে ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনিদের সঙ্গে গল্প করছেন বেগম খালেদা জিয়া। গত আট বছরে সরকারের বিভিন্ন দমন-পীড়ন ও আন্দোলনের সময় দলীয় নেতাকর্মীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন।

এছাড়া তারেক রহমানের বাসার কাছাকাছি একটি স্কুলে ভর্তি করা হয়েছে কোকোর দুই মেয়েকে। এখন থেকে স্থায়ীভাবে কোকোর পরিবারও লন্ডনে থাকবে। এ বিষয়েও পারিবারিকভাবে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এসব ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এই সফরের রাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।’ একই কথা বলেন আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ।

খুলনা থেকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘তৃণমূল নেতাকর্মীরা খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের বৈঠকের দিকেই চেয়ে আছেন।’

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার হোগলাপাশা ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক খেলাফাত হোসেন খসরু বলেন, ‘আমরা তৃণমূল নেতাকর্মীরা লন্ডন থেকে সুখবর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। আমাদের দৃষ্টি এখন লন্ডনের দিকে। সিনিয়র নেতাদের ফোন করে কুশলাদি বিনিময়ের আগেই জানতে চাই লন্ডনের কোনো খবর জানেন কি-না।’

খেলাফাত হোসেন খসরু বলেন, ‘আমরা আশা করি এবার হয়তো আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পাবে বিএনপি। তাছাড়া ভারতের সমর্থন আদায়ে করণীয় বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাবে এবং ত্যাগীদের নেতৃত্বে এনে সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে নতুন করে সফল আন্দোলনের নির্দেশনা লন্ডন থেকে আসবে।’ -ভোরের পাতা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *