Search
Friday 16 November 2018
  • :
  • :

এমন মানুষ বার বার জন্মায় না

এমন মানুষ বার বার জন্মায় না

ড. মো. নাছিম আখতার : স্বাধীন দেশ, স্বাধীন জাতিসত্তা। এই দুটি মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আরাধনার বস্তু। আমরা তাকাই প্যালেস্টাইনের ফিলিস্তিন জনগোষ্ঠীর দিকে। নিজের দেশে তারা পরবাসী। একসময় আমাদেরও এমনই আকুতি ও হাহাকার ছিল। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। প্রায় হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা ও সংস্কৃতিসহ সকল বিষয়ের অমিল থাকা সত্ত্বেও শুধু ধর্মীয় মিলের কারণে পূর্ব বাংলাকে পাকিস্তানের একটি প্রদেশ করা হয়। এই নতুন রাষ্ট্র পূর্ব বাংলার মানুষের জীবনে কোনো মুক্তির স্বাদ আনতে পারেনি। শাসকের হাত বদল হয়ে পূর্ব বাংলার জনগণ ভিনদেশি শাসক দ্বারা শাসিত হতে থাকে। আমাদের ওপর নেমে আসে নানা প্রবঞ্চনা ও শোষণ।

লাল সবুজের পতাকায় বিশ্বের বুকে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে এদেশের জন্ম হতো না। আমরা হয়তো পরাধীন জাতির শৃঙ্খলে আবদ্ধ থেকে যেতাম। বাঙালিদের স্বাধীন দেশ ও স্বাধীন জাতিসত্তা উপহার দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু জীবনের ১২টি বছর জেলে কাটিয়েছেন, ১৮ বার কারারুদ্ধ হয়েছেন, ২৪টি মামলায় আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন, দু’বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যিনি আমাদেরকে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ উপহার দিয়ে গেলেন, তাকেই কি না মৃত্যুবরণ করতে হলো নির্মম, নির্দয়ভাবে।

আজ আমরা এদেশে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরিতে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত। এটি কার অবদান? স্বাধীন দেশের নাগরিক বলেই চাকরি ক্ষেত্রে আমাদের নেই কোনো প্রবঞ্চনা বা অসামঞ্জস্য, নেই কোনো জাতিগত ভেদাভেদ। এখানে যোগ্যতাই মুখ্য। অথচ পকিস্তানি শাসনামলে চাকরি ক্ষেত্রে উচ্চ পদে আমাদের দেশের খুব কম সংখ্যক মানুষই সুযোগ পেতেন। চাকরি ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল স্পষ্ট। আমরা আজকে সমাজে যে সম্মানজনক অবস্থান পেয়েছি তা নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর অবদান। বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানি শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজনই বেশি সুবিধা ভোগ করত। বর্তমানে আমাদের দেশের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত। তাঁরা সফলতার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করছেন। দেশে পাঠাচ্ছেন বৈদেশিক মুদ্রা। বর্তমানে শীর্ষ প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অষ্টম। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ সালে প্রবাসীরা ১ হাজার ৩৬১ কোটি ডলার প্রবাসী আয় দেশে পাঠিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু বলতেন, “আমার জীবনের একমাত্র কামনা, বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের খাদ্য পায়, আশ্রয় পায়, শিক্ষা পায় এবং উন্নত জীবনের অধিকারী হয়।” প্রকৃতপক্ষে মানুষ যা ভাবে তাই তার কথার মাধ্যমে প্রকাশ পায়। এই কথাগুলোর মধ্যে দেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধুর মায়া-মমতা এবং তাদের উন্নত ভবিষ্যতের চিন্তা গভীরভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এমন মানুষ বার বার জন্মায় না। মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে তার ভাবাবেগ, তার কৃতজ্ঞতা বোধ। লাল সবুজের পতাকায় বাংলাদেশের মানচিত্রের রূপকার সেই বঙ্গবন্ধুকে বুকের গভীরে ঠাঁই দেওয়া প্রত্যেক দেশপ্রেমিক বাঙালির কর্তব্য। তাঁর অবদান স্মরণে রাখব, তবেই তো আমরা হতে পারব প্রকৃত দেশপ্রেমিক। সুচিন্তা ও ইতিবাচক ভাবনায় আলোকিত হয়ে উঠবে সমগ্র হূদয়।

আগস্ট মাস শোকের মাস। এই মাসে আমরা হারিয়েছি বাঙালি জাতির পিতাকে। আসুন, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে দেশকে বিশ্বের বুকে সম্মানজনক আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করি। লেখক ও শিক্ষাবিদ সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলি, ‘আমি সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালক শেখ মুজিবুর রহমানকে ভুলে যেতে পারি, কিন্তু বাঙালি জাতির কাণ্ডারী শেখ মুজিবকে ভুলতে পারি না। কেননা, আমাকে তাহলে নিজের পরিচয়টাই ভুলে যেতে হয়।’

লেখক: বিভাগীয় প্রধান (কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ); ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর।

সৌজন্যে : ইত্তেফাক