ঢাকা, ১১ সেপ্টেম্বর : রাজধানীর বনানী, ১৩ নং সড়ক, ৫৩ নং বাড়ি। বাড়িটির নাম হাওয়া ভবন। লন্ডনপ্রবাসী হাওয়া বেগম ছিলেন এই বাড়ির মালিক। তার কাছ থেকে বাড়িটি ভাড়া নেন খুলনার সাবেক এমপি আলী আজগর লবী ও এওয়াইএম কামাল। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয় ছিল এই ভবন। এই ভবনেরই ২য় তলায় ছিল তার অফিস। কিন্তু তিনি নিয়মিত বসতেন না। ২য় তলার আরেক রুমে বসতেন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও দলের তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং বর্তমানে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার নাম ভাঙিয়ে এই হাওয়া ভবন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো সারাদেশ।

বিএনপির আমলে কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি ও তাঁর ঘনিষ্ঠজন এই ভবনের নাম ভাঙিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন। এছাড়া হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক মন্ত্রী নন- এমন ব্যক্তিদের চেয়েও হাওয়া ভবনের নেতাদের ক্ষমতা বেশি ছিল। সেসব নেতার ভয়ে তটস্থ থাকতেন দেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিকসহ সব দফতরের কর্মকর্তারা।

হাওয়া ভবনের দুর্নাম হলেও তদ্বির, নিয়োগ-বদলিবাণিজ্য, টেন্ডারবাজি হতো গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের আরেক অফিস থেকে। তার পাঁচ তলাবিশিষ্ট অফিসটি ছিল হাওয়া ভবন থেকে পূর্বদিকে বনানী লেকের পাড়ে।

একটি সূত্রে জানা যায়, হাওয়া ভবন নিয়ে বিতর্ক ওঠার পর তারেক রহমান তাঁরই বাল্যবন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে হাওয়া ভবনে নিয়মিত আসতে নিষেধ করেন। এরপর মামুন বনানী লেকের পাড়ে ওই পাঁচ তলার ভবনটি ভাড়া নিয়ে অফিস করেন। যেখানে বিভিন্ন কাজের জন্য বস্তায় বস্তায় টাকা নিয়ে আসা হতো বলে তখন অভিযোগ ছিল।

হাওয়া ভবন ও মামুনের অফিসে যেসব মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের দাপট ছিল, তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিএনপির এই দুঃসময়ে দলের পাশে নেই। ওয়ান ইলেভেনের সময় কেউ গ্রেফতার হয়েছেন, আবার কেউ কেউ জিয়া পরিবারকে বিপদে রেখে পালিয়ে গেছেন। এখন কেউ বা দল ছেড়ে অন্য দল করছেন, আবার কেউ কেউ ব্যবসাবাণিজ্য দেদারসে চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বিএনপির কোনো কর্মকাণ্ডে তাঁদের দেখা যাচ্ছে না।

অনেকের প্রশ্ন, একসময় যাঁরা হাওয়া ভবন এবং তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে লাভবান হয়েছেন, লুটপাট করেছেন, দুর্নীতি করেছেন, তাঁরা এখন কোথায়?

হাওয়া ভবনের দাপুটে নেতারা হলেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, হারিছ চৌধুরী, ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবাল, রফিকুল ইসলাম বকুল, তৌহিদুল ইসলাম ওরফে আশিক ইসলাম, নুরু উদ্দিন অপু, আলী আজগর লবী, এমএএইচ সেলিম (সিলভার সেলিম), সাজ্জাদুল ইসলাম জয়সহ বেশ কয়েকজন।

সূত্রে জানা যায়, তারেক রহমানের সবচেয়ে কাছের লোক ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। হাওয়া ভবনের সবচেয়ে বিতর্কিত এই মামুন তারেক রহমানের বাল্যবন্ধু। হাওয়া ভবন ও তারেক রহমানের নাম ভাঙিয়ে দুর্নীতির শীর্ষে ছিলেন এই মামুন। বেশ কয়েকটি দুর্নীতির মামলায় ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

বিএনপির আমলে যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। তিনি ছিলেন হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। হাওয়া ভবনে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তারেক রহমানের সঙ্গে একত্রে তারাবি নামাজ পড়তেও তিনি হাওয়া ভবনে যেতেন বলে নেতাকর্মীদের বলে বেড়াতেন। সিএনজি অটোরিকশা খাতে তারেক রহমানের নাম করে বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় করেছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

এছাড়া তাঁর স্ত্রীর মানবাধিকার সংগঠনের অফিসের জায়গাও বিএনপির আমলে নেওয়া। সেই নাজমুল হুদা এখন আর বিএনপির সঙ্গে নেই। তিনি বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে বিভিন্ন সময়ে বিএনপির বিপক্ষে কথা বলেছেন, বিভিন্ন দল গঠন করেছেন।

হারিছ চৌধুরী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব। হাওয়া ভবনে তাঁর বেশ প্রভাব ছিল। তখন গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ৩৭টি বাড়ি তিনি নিলামে বিক্রি করে দেন। এছাড়া সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ নিয়ে যে বাড়িটিতে তিনি থাকতেন, সেই বাড়িটি  নিলামে বেনামে ক্রয় করেন। তবে যে ব্যক্তির নামে বাড়িটি ক্রয় করেন, ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি দলিল জমা দিয়ে দেন, যা পুনরায় সরকার নিয়ে নেয়। বাংলাদেশে দৃশ্যমান তার কিছুই নেই। দেশের বাইরেও আছে কি-না তা জানা যায়নি। ওয়ান ইলেভেনের পর থেকে হারিছ চৌধুরীর খোঁজ কেউ জানেন না।

একটি সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান ইলেভেনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িতে করে তাকে ভারতে পার করে দিয়ে আসা হয়। এরপর থেকে তিনি কোথায় আছেন তা কেউই জানেন না। তবে অনেকের ধারণা, তিনি ভারতে নেই। অন্য কোনো দেশে আছেন।

হাওয়া ভবনের আরেক কর্মকর্তা ও তারেক রহমানের বন্ধু ডা. ফিরোজ মাহমুদ ইকবাল, যিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অ্যাসাইনমেন্ট অফিসার ছিলেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন।

এছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা রফিকুল ইসলাম বকুল বর্তমানে দেশেই আছেন। তিনি হাওয়া ভবনের নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ-বদলি-পদায়ন, এসব বিষয়ের দেখভাল করতেন।

দৈনিক দিনকাল পত্রিকায় চাকরির সুবাদে তৌহিদুল ইসলাম ওরফে আশিক ইসলাম ছিলেন হাওয়া ভবনের মুখপাত্র। চারদলীয় ঐক্যজোট ক্ষমতায় আসার আগে তিনি ফকিরাপুলে একটি মেসে থাকতেন। শোনা যায়, ওয়ান ইলেভেনের সময় তিনি পালিয়ে আমেরিকা চলে যান। বর্তমানে তিনি সেখানেই রয়েছেন। বিএনপির আমলেই আমেরিকায় তিনি একটি পেট্রল পাম্প ও একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে তারেক রহমানের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলেও জানা গেছে।

তারেক রহমানের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন নুরু উদ্দিন অপু। তার বাড়ি মাদারীপুর। শ্রমিক লীগের এক নেতার ভাই তিনি। ওয়ান ইলেভেনের সময় অপু পালিয়ে মালয়েশিয়া চলে যান। সেখানেও চলেছে তার ধান্দা। সেখানে বসেও তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ আছে- এমন প্রচারণা চালিয়ে, তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে বিএনপির অনেক নেতার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

বিএনপির বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দেশে ফিরে ছদ্মবেশে আদালতে হাজির হন নুরু উদ্দিন অপু। আদালত তাঁকে কারাগারে প্রেরণ করেন। বর্তমানে তিনি কারাগারে।

আলী আজগর লবী ছিলেন খুলনা সদরের এমপি। তাঁরই ভাড়া নেওয়া ছিল হাওয়া ভবন। এ কারণে গত বিএনপির আমলে দু’হাত ভরে টাকা কামানোর সুযোগে কেউ বাধা দিতে পারেননি তাঁকে। আর এখন রাজনীতিতে কোথাও দেখা যায় না তাঁকে। শোনা যায়, নিজের ব্যবসাবাণিজ্য নিয়েই ব্যস্ত রয়েছেন।

বাগেরহাট-২ আসনের এমপি ছিলেন এমএএইচ সেলিম। হাওয়া ভবন তথা তারেক রহমানের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে আদমব্যবসা ছিল তাঁর দখলে। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই তিনি বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন। এখন নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

বগুড়ার সাবেক এমপি হেলালুজ্জামান তালুকদার লালুর ছেলে সাজ্জাদুল ইসলাম জয় বিদেশে পালিয়ে গেলেও এখন দেশে আছেন। বিএনপির অনেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন তিনি।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দাপটশালী মন্ত্রী শাজাহান সিরাজের ছেলে অমিতাভ সিরাজ অপু তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে হাওয়া ভবনের কর্মকর্তার পদ পান। হাওয়া ভবন এবং বাবার প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্নভাবে দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়ে তোলেন তিনি। বর্তমানে তিনি কোথায় আছেন কেউ বলতে পারছেন না।

এছাড়া নাটোরের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, আজিজুল বারী হেলাল, শফিউল বারী বাবু মাঠে আছেন। কিন্তু রাজনীতিতে সক্রিয় নেই। পিরোজপুরের শহিদুল হক জামাল নেই দলের কোথাও।

সাজ্জাদ হোসেন নাইট, আনোয়ার, ওসি হামিদ, মোটা তারেক, নূর আফরোজ জ্যোতি, জহিরুল ইসলাম চৌধুরী, কামরুল ইসলাম, সায়মন আকবরসহ আরও কয়েকজন ছিলেন বেশ দাপটের সঙ্গে। এখন আর তাদের কোনো কর্মকাণ্ড চোখে পড়ে না।

সূত্রে জানা যায়, দলের দুঃসময়ে দূরে থাকা হাওয়া ভবনের কেউ কেউ তারেক রহমানের দেশে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। তারেক রহমান দেশে ফিরলে বা পরিবেশ পরিস্থিতি ভালো হলে তাঁরা আবার বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হবেন। অনেকে মনে করেন, হাওয়া ভবনের বেশি বিতর্কিতরা দলে স্থান পেলে তা দলের জন্য আবার বিপদ ডেকে আনবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ এ বিষয়ে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘হাওয়া ভবনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত ছিলেন তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না। তবে ওই সময়ে বিএনপির ভরাডুরির জন্য ওই ভবনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিছুটা হলেও দায়ী।’ -ভোরের পাতা

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *