Search
Friday 22 June 2018
  • :
  • :

রেকর্ড শীতে কাঁপছে দেশ, তেঁতুলিয়ায় ২.৬ ডিগ্রি

রেকর্ড শীতে কাঁপছে দেশ, তেঁতুলিয়ায় ২.৬ ডিগ্রি

ঢাকা, ৯ জানুয়ারি : বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। চলতি মাসে প্রকাশিত আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে ‘অতিতীব্র’ শৈত্যপ্রবাহের উল্লেখ না থাকলেও ইতোমধ্যেই স্মরণকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছে। শৈত্যপ্রবাহে নাকাল মানুষসহ তাবৎ প্রাণিকুল। কৃষি, যোগাযোগসহ দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ তো বটেই, খোদ রাজধানীবাসীও প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে পা ফেলছেন না। সন্ধ্যা না ঘনাতেই সুনসান নগরী। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে দেশজুড়ে এবারই প্রথম চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার দেখা পাওয়া গেছে। একযোগে মৃদু, মাঝারি, তীব্র ও অতিতীব্র শৈত্যপ্রবাহের মুখোমুখি হতে হয়েছে দেশবাসীকে। আরও দু-এক দিন এ শৈত্যপ্রবাহ থাকবে বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে।

দেশে গতকাল সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস উত্তরবঙ্গের পঞ্চগড়ে। জেলাটির তেঁতুলিয়ায় অতিতীব্র শৈত্যপ্রবাহের কারণে ছিল এ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। গত ৫০ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন তাপমাত্রা।

আবহাওয়াবিদ আব্দুল মান্নান এ প্রতিবেদককে বলেন, ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ প্রায় ৫০ বছর আগে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হয়েছিল ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর পর প্রতিবছর দেশের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে গেলেও ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে তাপমাত্রা কখনো নামেনি। এর ব্যতিক্রম ২০১৩ সাল। সে বছর ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে তাপমাত্রা নেমে গিয়েছিল। ওই বছর ১০ জানুয়ারি নীলফামারীর সৈয়দপুরে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে।

এদিকে তীব্র শীতের কারণে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আলুক্ষেতে ছত্রাক জাতীয় রোগ দেখা দিয়েছে। ওষুধ ছিটিয়ে ফসল রক্ষার চেষ্টা করছে কৃষক। ঘন কুয়াশা আর তীব্র শীতে বোরো বীজতলা, আলু, সবজিক্ষেতসহ বিভিন্ন ফসলের ফলন ভীষণভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কৃষক।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আনোয়ার ফারুকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, শৈত্যপ্রবাহের কারণে ফসলের ক্ষতি হওয়াই স্বাভাবিক। তবে এ অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হবে না। কুয়াশাজনিত আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষায় কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সব ধরনের পরামর্শ প্রদান করা হচ্ছে।

তিনি যোগ করেন, ঘন কুয়াশা আর শৈত্যপ্রবাহের কারণে বোরো ধানের বীজতলা হলুদ বর্ণ হয়ে মরে যাচ্ছে বলে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে। আলুর ক্ষেতে লেটব্রাইট রোগসহ মড়ক দেখা দিয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, সারা দেশে তাদের ৪৩টি কেন্দ্রের মধ্যে গতকাল সৈয়দপুরে দেশের দ্বিতীয় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। এর পরেই নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৩ ডিগ্রি এবং দিনাজপুরে ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রংপুরের পরই রাজশাহী বিভাগে তীব্র শীত পড়েছে। এ বিভাগে সর্বাধিক শীত পড়েছে নওগাঁর বদলগাছীতে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ ছাড়া রাজশাহী জেলায় ৫ দশমিক ৩, বগুড়া ও ঈশ্বরদীতে ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে রাজধানীর ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ। গতকাল ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন জেলায় রাতের বেলায় আকাশ থেকে তুষারপাতের মতো কুয়াশা ঝরেছে গতকালও। একই সময় আসছে হিমালয়ের বরফশীতলতা নিয়ে উত্তরের কনকনে হাওয়া। সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষজন আগুন জ্বালিয়ে শীতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে চাইছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক সামছুদ্দীন আহমেদের দেওয়া তথ্যমতে, উত্তরাঞ্চলের মতো দেশের দক্ষিণাঞ্চলেও বয়ে যাচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। গতকাল চুয়াডাঙ্গায় ৫ দশমিক ৪, যশোরে ৫ দশমিক ৬, সাতক্ষীরায় ৭ দশমিক ৫ এবং খুলনায় ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এদিকে টাঙ্গাইলে ৬, ফরিদপুরে ৬ দশমিক ৯, মাদারীপুরে ৭ দশমিক ৭ এবং গোপালগঞ্জে সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৬ দশমিক ৫, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ও বরিশালে তাপমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শৈত্যপ্রবাহ আরও কয়েকদিন থাকবে- মন্তব্য করে এ আবহাওয়াবিদ বলেন, সাইবেরীয় উচ্চচাপ বলয় এশিয়ায়। ১০ জানুয়ারির পর সামগ্রিকভাবে সারা দেশের তাপমাত্রা বাড়তে পারে বলে ধারণা করছেন তিনি।

রংপুর ও পঞ্চগড় প্রতিনিধির পাঠানো খবরে বলা হয়, রংপুর ও পঞ্চগড় আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, গতকাল ভোর ৬টায় পঞ্চগড়ে ছিল স্মরণকালের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা- ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময় রংপুরের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মাত্র ৬ ঘণ্টার ব্যবধানে তাপমাত্রা বেড়েছে ১২ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রকৃতির এ বিচিত্র আচরণের সুষ্পষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করতে পারছেন না কেউ।

আবহাওয়া অফিসের সূত্রমতে, দুপুর ১২টায় পঞ্চগড়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দাঁড়ায় ১৫ ডিগ্রি এবং দুপুর ৩টায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। রংপুরে দুপুর ১২টায় ১৫ দশমিক ৩ ডিগ্রি এবং দুপুর ৩টায় ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উন্নীত হয় তাপমাত্রা। স্থানীয় আবহাওয়া অফিস বলছে, রাতে তাপমাত্রা আবার কমে যাবে। একই সঙ্গে অব্যাহত থাকবে শীতের কামড়।

রংপুর অফিসের আবহাওয়াবিদ মোহাম্মদ আলী বলেন, শীতকালে তাপমাত্রা সাধারণত ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ভোর ৬টা থেকে দুপুর ৩টার মধ্যে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটেছে সূর্যের কারণে। শৈত্যপ্রবাহে সচরাচর দিনেও সূর্যের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু গতকাল বিরূপ আবহাওয়ার পাশাপাশি সূর্যেরও দেখা মিলেছে। তাই দুপুরের তাপমাত্রা বেড়েছে।

পঞ্চগড় অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ রহিদুল ইসলাম বলেন, পঞ্চগড়ে সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড হলেও দুপুরের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ভোরে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে বেড়ে দুপুর ৩টায় হয়ে যায় ১৮ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটাকে প্রকৃতির দয়া বলা যেতে পারে। তবে এ ধরনের পরিবর্তনশীল আবহাওয়া প্রকৃতিতে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই বলে আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন।

তীব্র শীতে চরম দুর্যোগে পড়েছে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। কয়েকদিন ধরে চলা ঘন কুয়াশা ও উত্তরের হিমেল হাওয়ায় শীতপ্রবণ এ জেলার মানুষ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষ বিশেষ করে দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালক ও খেটে খাওয়া মানুষ দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। একটানা শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশায় লোকজন ঘর থেকে বের হতে পারছে না। কাজকর্ম না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। জেলার অসহায় শীতার্তরা শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্ট পাচ্ছে। শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ায় কাঁপছে পশুপাখি, জীবজন্তু ও মানুষ। পঞ্চগড় পৌরসভার মেয়র তৌহিদুল ইসলাম জানান, পৌর এলাকায় কম্বল পাওয়ার মতো লোকের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। সেখানে দুই মাস আগে জেলা প্রশাসন থেকে ৩৭৫টি কম্বল বরাদ্দ দিয়েছিলেন, যা অনেক আগেই বিতরণ করা হয়েছে।

পঞ্চগড়ের নবাগত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম জানান, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পাঁচ উপজেলায় ইতোমধ্যে ৩০ হাজার কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। আরও ২০ হাজার কম্বল চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান শীতার্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন বলেও তিনি জানান।

এদিকে একটানা শৈত্যপ্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারণে জেলা শহরসহ হাসপাতালগুলোয় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও হাঁপনি রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেকেই চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছেন।

পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. জহিরুল ইসলাম জানান, হাসপাতালগুলোয় শিশু ও বৃদ্ধ রোগীদের ভিড় বাড়লেও ওষুধপথ্য চিকিৎসাসেবাসহ সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে।

ঘন কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকলে আলু ও গমসহ রবিশস্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করছেন কৃষকরা। তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শামছুল হক জানান, কৃষকরা বোরো বীজতলা পলিথিনে ঢেকে দিয়েছেন। ফলে বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। মাঝে মাঝে ঘন কুয়াশা কেটে গিয়ে সূর্যের মুখ দেখা যাচ্ছে। এ কারণে অন্যান্য রবিশস্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই বলেও তিনি জানান। -আমাদের সময়