Search
Friday 22 June 2018
  • :
  • :

বিশ্বজুড়েই বৈরী আবহাওয়া

বিশ্বজুড়েই বৈরী আবহাওয়া

ঢাকা, ৯ জানুয়ারি : বড় একটি বন্যার ক্ষত না শুকাতেই তীব্র শৈত্যপ্রবাহের মধ্য দিয়ে নতুন বছর শুরু করেছে বাংলাদেশ। অবশ্য তীব্র এ শীতকে কৃষির জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছেন কৃষি অধিদপ্তর ও কৃষকরা। আর শুধু বাংলাদেশ নয়; বিশ্বজুড়েই বৈরী আবহাওয়া ছোবল হানছে এবার। সদ্য বিদায় নেওয়া বছরের আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে দাবানল, বন্যা, তুষার ঝড়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও শৈত্যপ্রবাহ বিপর্যস্ত করে তুলেছে পৃথিবীকে। বৈরী আবহাওয়ায় আক্রান্ত যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ইউরোপ, চীন, ভারত, জাপান, ভিয়েতনাম, নেপাল ও থাইল্যান্ডের জনজীবন।

গত বছরের শেষে দীর্ঘ মেয়াদি বন্যা ও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের পর বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র শৈত্যপ্রবাহের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। এ দেশের ইতিহাসে গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে গতকাল সোমবার পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। এর আগে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সেদিন সেখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ বছর দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। অক্টোবরে দুই দিন মিলিয়ে ২১২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এতে রাজধানীর জল থই থই রাজপথে নৌকায় চলাচল করতে হয়েছে মানুষকে। রাজধানীর বাইরে বড় বড় শহরেও জলজটে চরম দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধসে বহু মানুষ প্রাণ হারায়। এর পর দুই দফা দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ আরও একবার বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হাওরের ফসলহানি হয় আগাম বন্যাতে।

শীত ও শৈত্যপ্রবাহে শুধু বাংলাদেশ নয়, কাঁপছে বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলো পর্যন্ত। গত দুই সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ তুষার ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাড়ে আট কোটির বেশি মানুষ। ‘স্নোজিলা’ নামের এ তুষার ঝড়ে এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে গণমাধ্যম। আরকানসাস, টেনেসি, কেনটাকি, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, ভার্জিনিয়াসহ দক্ষিণাঞ্চলের ২০ অঙ্গরাজ্যে তুষার ঝড় ব্যাপক তাণ্ডব চালাচ্ছে। পূর্বাঞ্চলে ঝড়ের কারণে ১১টি রাজ্যে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। নিউইয়র্ক, নিউজার্সিসহ বিভিন্ন রাজ্যে ফ্লাইট চলাচল বাতিল হয়ে গেছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

প্রচ তুষারপাতে চীনের কয়েকটি প্রদেশে গত দুই সপ্তাহ ধরে জনজীবন প্রায় স্থবির। বন্ধ রয়েছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের সব ধরনের গণপরিবহন। সেখানে একটি রেলস্টেশনে আটকা পড়েছে প্রায় এক লাখ মানুষ। একটানা ভারী তুষারপাতের কারণে কর্তৃপক্ষ তিনটি বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়াও অনেক বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিপর্যয় চলছে। নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তড়াই অঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ওই এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। নভেম্বরে বন্যায় অনেকেরই মৃত্যু হয় নেপাল ও ভারতে। অস্ট্রেলিয়া, পর্তুগাল, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় তাণ্ডব চালিয়েছে দাবানল। এখন শৈত্যপ্রবাহের দাপট চলছে ভারত ও বাংলাদেশে।

যুক্তরাজ্যে চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তুষারপাতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে লন্ডনসহ উত্তর ইউরোপের যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দুই সহস্রাধিক স্কুল। ইউরোপজুড়ে ৫০ সহস্রাধিক বিমানযাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়েছেন। তুষারপাতে নির্ধারিত সব ট্রেনই দেরিতে চলাচল করছে। গত ডিসেম্বরে ধুলোমেঘের আস্তরণ ও বিষাক্ত বায়ুদূষণের কারণে পাকিস্তান ও ভারতের হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়। গৃহবন্দি হয়ে পড়ে মানুষ। ফ্রান্স ও জার্মানিতে ডিসেম্বর থেকেই জনজীবন তুষারপাতে বিপর্যস্ত হয়ে আছে।

শীতকালীন তাপমাত্রা নিয়ে গবেষণা করছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। গবেষণায় উঠে এসেছে, আগে একটা বড় সময় বিরতি দিয়ে অতি শীত, অতি গরম বা অতি বৃষ্টির ঘটনা ঘটত। কিন্তু এখন আবহাওয়া ব্যাকরণ মানছে না। কখনও সময়ে আবার কখনও অসময়ে আঘাত হানছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শৈত্যপ্রবাহ ও কুয়াশাচ্ছন্ন দিনের সংখ্যা বাড়ছে। সার্ক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, আগামীতে আবহাওয়া আরও বৈরী হয়ে উঠতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আগে শীত মৌসুমে একটি শৈত্যপ্রবাহের ব্যাপ্তি ছিল তিন থেকে চার দিন। এখন তা বেড়ে সাত থেকে ১২ দিন ধরে চলছে। আর শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যাও আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।

শৈত্যপ্রবাহ ও দিনের বেলায় ঘন কুয়াশা থাকার বিষয়ে আবহাওয়াবিদ ড. ওয়াহিদুজ্জামান এ প্রতিবেদককে বলেন, এশিয়ান ধুলোমেঘের কারণে সূর্যের আলো নিচে নামতে পারছে না। এ কারণেই দেশে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, এশিয়ার দেশগুলোতে বছরে একাধিকবার ফসল উৎপাদনের কারণেই আকাশে ধুলোর আস্তরণ জমছে। ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ধুলোর আস্তরণ পূর্বদিকে আসতে শুরু করে, যা ফেব্রুয়ারির শেষদিকে আবার উল্টোদিকে মোড় নেয়। ফলে এ সময়টায় ধুলোর কারণে সূর্যের আলো নিচে নামতে পারে না। কয়েক দিন সূর্যের তাপ না পাওয়ার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে শৈত্যপ্রবাহ। এ সময় আকাশ মেঘলা থাকলেও কোথাও মেঘ হয় না। তিনি জানান, সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ বিজ্ঞান অ্যাসোসিয়েশন ও ভারতের যৌথ গবেষণায় এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে।

সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পরিসংখ্যান : গত ৫০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে গতকাল পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। এর আগে সবচেয়ে কম তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ১৯৬৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে। সেদিন সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ২০১৩ সালের ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল। এখানে তখন তাপমাত্রা ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে। ২০০৩ সালের শীতে ঢাকার তাপমাত্রা ৮ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও রাজশাহীতে ৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছিল। গত ১০০ বছরের মধ্যে রাজধানীতে ১৯৬৪ সালে তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ৫ দশমিক ৬ এবং ১৯৬২ সালে শ্রীমঙ্গলে ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমেছিল।

বাড়ছে রোগব্যাধি : দেশব্যাপী বেড়েছে শীতজনিত রোগে আক্রান্তের সংখ্যা। সর্দি-কাশি-জ্বর, নিউমোনিয়া ও ব্রঙ্কাইটিস রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। বিশেষত শিশু ও বয়স্করা। শীতজনিত কারণে গত এক সপ্তাহে সারাদেশে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ডিজিল্যাবের চিকিৎসক ডা. কিসমত আরা নাহার জানান, শীতে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও নিউমোনিয়া, সাধারণ সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন মানুষ। বয়স্কদের বাতজনিত সমস্যা বেড়ে গেছে। শিশুরাও ভুগছে নানা রোগ-ব্যাধিতে।

কৃষির জন্য আশীর্বাদ : তীব্র শীত আর কুয়াশার কারণেই এবার সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষির জন্য এ শীতকে আশীর্বাদ হিসেবেই দেখছেন কৃষি অধিদপ্তর ও কৃষক। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীত এবার দীর্ঘ হলে শীতকালীন ফসল গম, ভুট্টা ও চায়ের উৎপাদন বাড়বে। শীতের স্বাভাবিক আচরণ ঠিক থাকলে যথাসময়েই আলু, গম, সরিষা ও ভুট্টা ঘরে তুলতে পারবেন কৃষক। তবে বোরোর বীজতলা ও আলুর কিছুটা ক্ষতি হতে পারে। তাই বীজতলায় পর্যাপ্ত পানি দেওয়া অথবা কুয়াশা থেকে রক্ষার জন্য বীজতলা ঢেকে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরেরর পরিচালক কৃষিবিদ আবদুল মান্নান আনসারী। এবারের শীত চা চাষের জন্য উপকারী। শীত আর শিশিরে চায়ের কচি পাতা সবুজ হতে শুরু করেছে। -সমকাল