Search
Sunday 22 May 2022
  • :
  • :

বাড়ছে টার্গেট কিলিং অসহায় পুলিশ

বাড়ছে টার্গেট কিলিং অসহায় পুলিশ

মোয়াজ্জেম হোসেন নান্নু, ২ নভেম্বর : কোনোভাবেই প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। পুলিশের নজিরবিহীন নিরাপত্তা বেষ্টনীও কাজে আসছে না। অফিস, বাসা-বাড়ি, প্রকাশ্য রাজপথ এমনকি জনবহুল রাজধানীর শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের মতো স্থানেও হানা দিচ্ছে টার্গেট কিলাররা। নির্বিঘ্নে খুন করে পালিয়েও যাচ্ছে।

টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হচ্ছেন ব্লগার, ব্যবসায়ী, পুলিশসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার মানুষ। বাদ যাচ্ছেন না বিদেশী নাগরিকরাও। এসব খুনের ঘটনা সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আতংক ছড়াচ্ছে, তেমনি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছে পুলিশও।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, একটি চক্র দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে টার্গেট কিলিংয়ে নেমেছে। পেশাদার খুনি, অপরাধী ছাড়াও ধর্মীয় উগ্রপন্থী সংগঠনের কিছু সদস্য এ চক্রে রয়েছে বলে তাদের আশংকা। এসব টার্গেট কিলিংয়ে বিনিয়োগ করা হচ্ছে মোটা অংকের টাকা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্ন মতাবলম্বীরাও টার্গেট হচ্ছেন এসব কিলারের। টার্গেট কিলিংয়ের এসব ঘটনায় অসহায় আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। রোববার মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলামও সেই অসহায়ত্বের কথা জানান।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, টার্গেট কিলিং বা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা খুব সহজ কাজ নয়। কেউ যদি হত্যার জন্য টার্গেট করে আইনশৃংখলা বাহিনীর পক্ষে তা আগে থেকে জানা সম্ভব নয়। কারণ হিসাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঠেকানোর মতো প্রচুর জনবলও আমাদের নেই। এর আগে পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানেও এমন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দুই বিদেশী নাগরিককে টার্গেট করে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডগুলো টার্গেট ছিল বলে ঠেকানো সম্ভব হয়নি।

পুলিশের ভারপ্রাপ্ত আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারী রোববার তার দফতরে এ প্রতিবেদককে বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে শক্তিশালী একটি চক্র কাজ করছে। বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করতে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের ব্যবহার করে একের পর এক এসব নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। ইতিমধ্যেই আইনশৃংখলা বাহিনী এদের একটি অংশকে চিহ্নিত করেছে দাবি করে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঞ্চল্যকর অনেক খুনের ঘটনা উদ্ঘাটন করতে না পারায় বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে। অপরাধীদের গ্রেফতার ও আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব যাদের, সেই পুলিশ সদস্যরাও এখন অপরাধীদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। পুলিশের ভেতর ভীতি ছড়িয়ে দিতে এমন খুনের ঘটনা ঘটানো হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশানে খুন হন ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা। এর মাত্র ৫ দিন পর রংপুরে খুন হন জাপানের নাগরিক কুনিও হোশি। দুই বিদেশী হত্যাকাণ্ডের পরই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করে বলে খবর দেয় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ। এ পরিস্থিতিতে হঠাৎ করেই বাংলাদেশে জঙ্গি উত্থানের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। কয়েকটি দেশ বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের চলাচলে সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়। এ নিয়ে সর্বত্র আলোচনার ঝড় ওঠে। তবে প্রথম থেকেই আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসছে বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়।

এরপর রাজধানীর গুলশান-বারিধারায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েন করা হয় বিজিবি। দুর্গাপূজা ও আশুরাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে নেয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এরপরও ২৩ অক্টোবর আশুরার আগের রাতে হোসনি দালানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। দুজন নিহত ছাড়াও দেড় শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এ ঘটনার পর পুলিশ হতবাক হয়ে পড়ে।

এর মধ্যেই শনিবার দুপুরে রাজধানীর শাহবাগে জনাকীর্ণ আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন জাগৃতি প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সল আরেফিন দীপন। প্রায় একই সময়ে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় নিজ অফিসে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হন শুদ্ধস্বরের স্বত্বাধিকারী আহমেদ রশিদ টুটুলসহ তিনজন।

এর আগে ৫ অক্টোবর বাড্ডায় নিজ বাসায় খুন হন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খিজির খান। এর আগে গোপীবাগে নিজ বাসায় খুন হন লুৎফর রহমান ফারুকীসহ ৬ জন। গত বছরের আগস্টে তেজতুরিবাজারে নিজ বাসায় একই কায়দায় খুন হন হাইকোর্ট মাজারের খতিব ও একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের উপস্থাপক নূরুল ইসলাম ফারুকী। চলতি বছরের ১৫ ফেব্র“য়ারি মিরপুরে নিজ বাসার অদূরে খুন হন ব্লগার রাজীব হায়দার। এর মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ২৬ ফেব্র“য়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় স্ত্রীর সামনেই খুন হন মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ রায়। এ ঘটনায় আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আাহমেদ বন্যা। একই বছরের ১২ মে সিলেটে প্রকাশ্য দিবালোকে দুর্বৃত্তদের হাতে খুন হন ব্লগার অনন্ত বিজয় দাস। এর কয়েকদিন পর ৭ আগস্ট ঢাকার গোড়ানে খুন হন ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জি নিলয়। এসব প্রতিটি খুনই ছিল পরিকল্পিত এবং টার্গেট কিলিং। চাঞ্চল্যকর এসব খুনের ঘটনার বেশির ভাগই এখনও রহস্যাবৃত রয়ে গেছে।

অপরাধ-বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃত হত্যাকারীরা গ্রেফতার এবং দ্রুত বিচার না হওয়ায় এ ধরনের টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা বাড়ছে। তবে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী এ প্রতিবেদককে বলেছেন, অতীতে বাংলাদেশ পুলিশ জঙ্গিবাদ, চরমপন্থী, নাশকতাকারী ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখিয়েছে। সেই সাফল্য ধরে রাখার জন্য পুলিশ আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কোনোভাবেই এ দেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র হতে দেয়া হবে না। তিনি বলেন, দেশকে নিয়ে সব ধরনের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করা হবে। দেশে জেএমবি, হুজিসহ বিভিন্ন নামে জঙ্গিবাদের উত্থান যাতে না ঘটে সেজন্য আইনশৃংখলা বাহিনী সতর্ক আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সূত্র : যুগান্তর




Leave a Reply

Your email address will not be published.