Search
Tuesday 17 May 2022
  • :
  • :

পারিবারিক নির্যাতন : একটি বিশ্বসমস্যা

পারিবারিক নির্যাতন : একটি বিশ্বসমস্যা

-শাহ্ আব্দুল হান্নান

নারীর মর্যাদা রক্ষায় আগ্রহী আমার এক ভাতিজি যে আমেরিকায় পিএইচডি করার পর অধ্যাপনা করছে, আমাকে এক চিঠিতে লেখে- “আপনি কি জানেন যে বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের ইমামেরা কি যৌতুক, স্ত্রীকে প্রহার, এসিড নিক্ষেপের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখার জন্য ট্রেনিং পেয়েছেন বা তাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়? এসবের ফলে বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীরা কষ্ট পাচ্ছেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, বাংলাদেশের ওয়াজ-মাহফিল ও খুতবায় সাধারণত নারীদের স্বামীদের মানতে, খেদমত করতে এবং সম্মান করতে বলা হয়। কিন্তু পুরুষদের তাদের স্ত্রীদের সম্মান করতে কদাচিৎ বলা হয়। কোনো কোনো সময় আমি নিজে শুনেছি, এ ওয়াজকারীগণ পুরুষদের স্ত্রীর প্রতি ভালো ব্যবহার করতে বলেন। নিশ্চয়ই এটা ভালো কথা। কিন্তু ভালো ব্যবহার করা, দয়ালু হওয়া ‘সম্মান করা’ থেকে আলাদা। আমার কাছে মনে হয়, যতক্ষণ না স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক সম্মানবোধ হবে, তত দিন স্বামীর রাগের মাথায় স্ত্রীদের আঘাত করার প্রবণতা থেকে যাবে। কেননা, স্বামী সাধারণত শারীরিকভাবে শক্তিশালী হয়ে থাকে এবং কোনো কোনোভাবে নিজেকে উৎকৃষ্ট মনে করে। সুতরাং পুরুষেরা বাড়ির কর্তা হিসেবে যেমন ছেলেমেয়েদের শারীরিকভাবে শাস্তি দিতে পারে, তেমনি স্ত্রীকেও শারীরিকভাবে শাসন করতে পারে বলে মনে করে।

যদিও বেশির ভাগ, বিশেষ করে মুসলিম সমাজে নারী ও শিশুদের তাদের শারীরিক দুর্বলতার কারণে এক করে দেখার প্রবণতা রয়েছে, তথাপি আমি মনে করি, নারীকে শিশুর সাথে এক করে দেখা সঙ্গত নয়। তাকে পূর্ণবয়স্ক পুরুষের মতোই মনে করতে হবে যে তারও পূর্ণগঠিত মগজ ও অনুভূতি রয়েছে। তারও একই ধরনের সম্মান পাওয়ার অধিকার রয়েছে। আমি এসব উল্লেখ করছি, কেননা ঐসব এখানে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় এসেছে।”

আমি এর উত্তরে অত্যন্ত সংক্ষেপে লিখি, ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মসজিদ মিশন- এসব সংগঠন ইমামদের ট্রেনিং দিয়ে থাকে। কিন্তু তাদের ট্রেনিং প্রোগ্রামে এমন কিছু আছে বলে জানি না যে স্ত্রীকে মারা একটি নিন্দনীয় কাজ এবং একটি অপরাধ। তবে ইমামেরা এসিড নিক্ষেপ ও যৌতুকের বিরুদ্ধে কখনো কখনো কথা বলে থাকেন। তোমার এ কথা সঠিক যে, এরা স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান অথবা নারীর প্রতি সম্মান করার কথা কদাচিৎ বলে থাকেন। এরা প্রকৃতপক্ষে এসব শব্দের পার্থক্যের তাৎপর্য বুঝে বলেন বলে আমার মনে হয় না। যারা নিয়মিত আলোচনা করেন, তাদের কেউ কেউ নারীর প্রতি অত্যন্ত সম্মানসূচক আলোচনা করে থাকেন। আমার কোনো সন্দেহ নেই, অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। সামনে মুসলিম নারীর অবস্থা আরো দ্রুত পরিবর্তন হবে।’

এর উত্তরে আমার ভাতিজি একটি লম্বা পত্র দেয়। এর সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ : ‘আমার মনে পড়ে অল্প বয়সে আমি পত্রিকা পড়ার সময় দেখতাম প্রত্যেক দিন স্ত্রীকে প্রহার করার ঘটনা। আমাদের প্রতিবেশী এবং আত্মীয়দের মধ্যেও আমি এসব গৃহবিবাদের কথা শুনতাম। পাশ্চাত্যে এর মূল কারণ মদ এবং মাদকজাতীয় দ্রব্য। কিন্তু ইসলামে এসব হারাম। সুতরাং মুসলমানদের মধ্যে এগুলো হবে কেন? আমার মনে হয়, ইমামদের খুব ভালো করে শিক্ষা দিতে হবে। তাহলে হয়তো ফল হতে পারে।

আমি কোনো মাওলানাকে বলতে শুনি না যে, যেসব নারীর শিক্ষার জন্য তাদের পিতা-মাতা অনেক অর্থ ব্যয় করেছেন, ওইসব নারীও যুগের প্রেক্ষাপটে বেশি সময় ধরে অনেক বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং এখন যদি তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে চান তাহলে তাদের স্বামীদের উচিত ঘরের কাজে সাহায্য করা এবং স্ত্রীদের তাদের শিক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে সুযোগ করে দেয়া। আমার মনে হয়, মাওলানাদের যদি সুযোগ থাকত তাহলে বেশির ভাগ বিষয়ে নারীরা হয়তো পড়াশোনারই সুযোগ পেত না। কেননা, মাওলানাদের বেশির ভাগই মনে করেন, মেয়েদের কাজ হচ্ছে ঘরসংসার করা। যদি একজন মহিলা পদার্থবিদ্যা পড়ে পদার্থবিদ হন যে কাজে হয়তো তাকে ল্যাবরেটরিতে অনেক সময় দিতে হয়, তাহলে তার স্বামীর চা কে বানাবে?

চাচা, আমি আপনাদের কাছে স্বীকার করছি, যদিও অন্য কোথাও বলব না যে নারী হিসেবে আমি আমেরিকায় আমার নিজের দেশ থেকে অনেক বেশি সম্মান পাই। চাচা, আমি আপনার কাছে আমার কিছু দুঃখ প্রকাশ করছি।’

এর উত্তরে আমি বিস্তারিত লিখেছি। তাতে নারী সমস্যার অনেক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি লিখেছি- ‘স্নেহের ভাতিজি, আমি তোমার সঙ্গে একমত যে, পাশ্চাত্যের তুলনায় মুসলিম বিশ্বে মদ ও মাদকদ্রব্যের সমস্যা কম হওয়ার কারণে এখানে স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন হওয়ার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই, কুরআনেও এর কোনো সত্যিকার ভিত্তি নেই। কিছু লোক অবশ্য তাদের আচরণকে যুক্তিসঙ্গত প্রমাণ করার জন্য কোনো কোনো আয়াতের অপব্যাখ্যা করে। এটি অবশ্য একটি ভিন্ন বিষয়, যার ওপর তুমি ড. আব্দুল হামিদ আবু সুলেমানের বই ‘Marital Discord’ পড়ে দেখতে পারো।

আগেও আমি বলেছি, মনে হয় নারীদের অন্তত প্রকাশ্যে পাশ্চাত্যে অধিক সম্মান করা হয়। কিন্তু আম্মু! নিশ্চিত নই, এ সম্মানদানে এরা কতটুকু আন্তরিক। আমি পড়ে থাকি এবং শুনে থাকি, সেসব দেশের নারীরা ধর্ষণের ভয়ে সব সময় আতঙ্কিত থাকে। এ ব্যাপারে আমি তোমার কাছে সত্য জানতে চাই।

মনে হয়, মুসলিম বিশ্বে মানবাধিকার ও সহনশীলতার ব্যাপারে গভীর সমস্যা আছে। কেননা, এখানে নানা কারণে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শিকড় গাড়তে পারেনি। এমনকি পাশ্চাত্যেও, কিছু ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের ওপর একনায়কত্বকে পছন্দ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের অগ্রগতি হবে। তাহলে সব সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিতরা সুবিধা পাবে।

আম্মু! আমি মনে করি, পুরুষরা আরো বহু দিন এ রকমই থাকবে। এরা এদের স্ত্রীদের কাছে চা ও খাবার চাইবে। জানি না, কিভাবে এর পরিবর্তন হবে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, এটা চিরদিন চলতে পারে না। আমি বুঝি না, যেখানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সব রাষ্ট্রীয় এবং নবীজীবনের দায়িত্বের ব্যস্ততা সত্ত্বেও ঘরের কাজ করতেন, সেখানে আমরা পুরুরুষেরা কেন ঘরের কাজে সহায়তা করব না।’

পারিবারিক নির্যাতন বা স্ত্রী নির্যাতনের সমস্যাটি একটি বিশ্বজনীন সমস্যা। আমাদের এ বিষয়ে গভীর নজর দিতে হবে এবং এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

আমাদের বুঝতে হবে, আল্লাহ পাক সবাইকে সম্মানিত করেছেন এবং বলেছেন, ওয়া লাকাদ কাররামনা বানি আদাম। অর্থাৎ আমি আদমের সন্তানদের সম্মানিত করেছি (বনি ইসরাইল : ৭০)।

আল্লাহ আরো বলেছেন, ‘সব মানুষকে আমি সর্বোত্তম মডেলে সৃষ্টি করেছি। (লাকাদ খালাকনান ইনসানা ফি আহসানি তাকবীম- সূরা তীন)। এসব বিশ্বব্যাপী আমাদের ব্যাপকভাবে প্রচার করতে হবে। কুরআনের ৯৯ শতাংশ আয়াতে নারী-পুরুষের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। কেবল কয়েকটি আয়াতে পার্থক্য করা হয়েছে, যার মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীকে সুবিধা দেয়া হয়েছে এবং দু-একটি ক্ষেত্রে পুরুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। সার্বিক বিচারে এতে সমতাই বুঝায়।

নারীর অধিকার নিয়ে সবাইকে কাজ করতে বলি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি) প্রকাশিত আব্দুল হামিদ আবু শুক্কাহ লিখিত ‘বহু যুগে নারী স্বাধীনতা’ পড়তে অনুরোধ করছি (চার খণ্ড)। বিআইআইটির যোগাযোগের ঠিকানা বাড়ি নং-৪, রোড নং-২, সেক্টর ৯, উত্তরা, ফোন নং- ০২৮৯১৭৫০৯, email publication biit@gmail.com
লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার

 

সৌজন্যে: নয়াদিগন্ত




Leave a Reply

Your email address will not be published.