Search
Wednesday 21 November 2018
  • :
  • :

পদ্মা নদীর পানি বাড়ছেই, অর্ধশত পরিবার পানিবন্দি

পদ্মা নদীর পানি বাড়ছেই, অর্ধশত পরিবার পানিবন্দি

রাজশাহী, ১১ সেপ্টেম্বর : রাজশাহীতে পদ্মা নদীর পানি বাড়ছেই। এতে নদীর ওপারের বিভিন্ন চরে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার পবা উপজেলার ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম চরখিদিরপুরে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে প্রায় অর্ধশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে পরিবারগুলো মানবেতন জীবনযাপন করছে।

অবশেষে সোমবার সকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাহিদ নেওয়াজ চরখিদিরপুর ও পার্শ্ববর্তী মধ্যচর পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি সেখানকার বন্যাকবলিত ৫০টি পরিবারের প্রত্যেকটিতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ দুই হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল দিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় দারুণ দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা। গবাদিপশু রাখার মতোও জায়গা নেই তাদের। কোথাও কোথাও ঘরের চালার ওপর পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। নলকূপ ডুবে যাওয়ার এলাকার মানুষ খাবার পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। উপায়হীন হয়ে তারা একেবারে ভারতীয় সীমান্তের প্রায় শূন্যরেখার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন।

রাজশাহী শহরের দক্ষিণে পদ্মা নদীর ওপারে অবস্থিত এই গ্রামের তিন দিক দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত। একদিকে শুধু বাংলাদেশ, তাও আবার পদ্মা নদী দিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। পদ্মা নদীর ভাঙনে এই গ্রামটি ছোট হতে হতে একেবারে ভারতীয় সীমান্তের কাছে গিয়ে ঠেকেছে। ভাঙনে কৃষিজমি হারিয়ে গ্রামের মানুষ মূলত গবাদি পশু পালন ও মৎস্য শিকার করে জীবিকা নির্বাহী করেন।

সোমবার সকালে চরখিদিরপুরে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের নিমাঞ্চলের প্রায় অর্ধশত বাড়ি পানিবন্দি হয়ে আছে। দেখা গেল, ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে পড়ার কারণে কৃষক মোজাম্মেল তার পরিবারের গো-খাদ্য ও গৃহস্থালির তৈজসপত্র একটি গরুর গাড়ির ওপরে তুলে রেখেছেন। গ্রামের বেশির ভাগ পরিবারের মেঝেতে পানি উঠেছে। অনেকেই ঘরের বরান্দায় মাচা তৈরি করে ও চৌকি পেতে সেখানেই রান্না খাওয়া, সেখানেই ঘুমানোর ব্যবস্থা করেছেন। যাদের বাড়িতে মাচা করার মতো পরিবেশ নেই, তারা ভারতীয় সীমান্তবর্তী এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। গ্রামের প্রায় সব কয়টি নলকূপের গলা পর্যন্ত পানি উঠেছে। এ জন্য এলাকাবাসী খাবার পানির সঙ্কটে ভুগছেন।

গৃহবধূ আছিয়া বেগম বলেন, প্রতিদিন কোমর পানিতে ভিজে তার মেয়ে স্কুলে যায়। ভেজা কাপড়েই মেয়েকে সারাদিন স্কুলে থাকতে হবে। এ জন্য ক্লাস শুরুর প্রায় এক ঘণ্টা আগেই মেয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়, যাতে স্কুলে গিয়ে ক্লাস শুরু আগে গায়ের কাপড়টা শুকিয়ে নিতে পারে। আসার সময় আবার কাপড় ভিজে যায়। সেটিই বাড়িতে এসে আবার শুকিয়ে পরের দিন পরে যেতে হয়।

গ্রামের বাসিন্দা মুক্তার হোসেন বলেন, দিনদিন পানি বাড়ছেই। তাদের ঘরের ধান, কলাই, মসুর পানিতে ভিজে যাচ্ছে, গরু ছাগল নিয়ে তার স্বামী ভারতের সীমান্তের কাছে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নিজেও বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের রেখে সাতটা ছাগল ও তিনটা গরুকে বাঁচানোর জন্য সীমান্তের কাছে অবস্থান করছেন। এখানে গরুর ছাগলের খাবার আছে। কিন্তু বাড়ি যেতে হলে এক কোমার পানি ভেঙে যেতে হচ্ছে। নিজের খাবারের জন্য সারাদিনে একবার বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করতেই হচ্ছে।

গ্রামটি পবা উপজেলার হারিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে পড়েছে। যোগাযোগ করা হলে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মফিদুল ইসলাম বলেন, চরখিদিরপুর গ্রামের বেশিরভাগ অংশের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। খবর পেয়ে তিনি ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছে দেয়ার জন্য ইউএনওকে অনুরোধ করেন। ইউএনও তাকে এবং প্রকল্প বাস্তাবায়ন কর্মকর্তাকে নিয়ে গিয়ে বন্যার্তদের কিছু সহযোগিতা করেছেন।

রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের পানি তথ্য সরবরাহকারী এনামুল হক জানান, প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ সেন্টিমিটার করে পদ্মা নদীর পানি বাড়ছে। সোমবার বিকাল ৩টায় রাজশাহী নগরীর বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার নদীর পানি ১৭ দশমিক ১৪ মিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছিল। রাজশাহীতে পদ্মার পানির বিপদসীমা ১৮ দশমিক ৫০ মিটার।

এদিকে অব্যাহত পানি বৃদ্ধিতে রাজশাহীর বাঘা ও গোদাগাড়ী উপজেলার চরাঞ্চলে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে বাঘার চকরাজাপুর উচ্চ বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। পড়াশোনা নিয়ে বিপাকে পড়েছে স্কুলটির প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী। নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে এবার বিপদসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সর্বশেষ ২০১৩ সালে পদ্মার পানি বিপদসীমা অতিক্রম করেছিল।