Search
Tuesday 24 May 2022
  • :
  • :

দীপন মানে আলোকিত করা

দীপন মানে আলোকিত করা

হাসান শফি

দীপনের সঙ্গে আমার কখনও কথাবার্তা বা আলাপের সুযোগ হয় নি। তবে আমি তাকে চিনতাম। দূর ও কাছ থেকে অনেকবারই দেখেছি তাকে। ওর বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। আমার গবেষণা তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন তিনি। সেই সূত্রে ও অন্যান্য উপলক্ষে অনেকবারই আমাকে তাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বাসায় যেতে হয়েছে। সেখানেও মাঝে মাঝে দীপনকে দেখেছি। পরবর্তী সময়ে একজন নবীন প্রকাশক হিসেবেও তাকে দেখেছি, তার সম্পর্কে কমবেশি জেনেছি। সমাজের আর পাঁচটা ক্ষেত্রের মতো আমাদের প্রকাশকদের মধ্যেও রয়েছে নানা দলমতের মানুষ। রয়েছে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। কিন্তু সবাইকে দেখেছি ভদ্র শান্ত চরিত্রের ছেলে হিসেবে দীপনের প্রশংসা করতে। কোনো বিষয়েই কোনো চরমপন্থী মতামত সে পোষণ বা প্রকাশ করতো বলে কারো কাছ থেকেই আমি শুনি নি। প্রকাশক হিসেবে অনেক লেখকের অনেক ধরনের বই সে বের করেছে। অভিজিৎ রায় তার অনেক লেখকের একজন মাত্র। তাঁর মৃত্যুর পরপর ফেসবুকে লেখা ফরহাদ মজহারের একটি স্ট্যাটাস থেকে জানতে পেলাম, দীপন ছিল তাঁরও প্রকাশক। বেঁচে থাকলে হয়তো দীপনের প্রকাশনা থেকে কোনোদিন আমারও কোনো বই বেরুতো।

অনেক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এদেশে যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখির মাধ্যমে বুদ্ধির মুক্তি ও স্বাধীন চিন্তাচর্চার পক্ষে কথা বলে আসছেন তাঁদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় একজন অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। এক সময় চীনপন্থী বামধারার প্রতি সহানুভূতিশীল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে সাদা দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, বর্তমানে তাঁর অবস্থান ধর্মীয় উগ্রবাদী ও তথাকথিত সেক্যুলার উগ্রবাদী উভয় গোষ্ঠী থেকে দূরে। উদার মানবতাবাদী, যুক্তিবাদী ও মোটামুটি সমন্বয়পন্থী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী একজন শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবী হিসেবে তাঁর অগণিত ছাত্র, পাঠক ও অনুরাগীদের কাছে তাঁর পরিচয়। যাঁরা হয়তো তাঁর সঙ্গে অনেক বিষয়েই সহমত নন, এমন কি তাঁরাও কেউ তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করবেন বলে মনে হয় না। সেদিক থেকে আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিম-লে তিনি প্রায় নিঃসঙ্গ পথিক। সকল রকম মতান্ধতা, দলান্ধতা ও উগ্রপন্থার ঊর্ধ্বে একটি যুক্তবাদী কিন্তু পরমতসহিষ্ণু, ন্যায় ও সমানাধিকারভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পক্ষে বই ও পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, সভা-সেমিনারে বক্তৃতা, বৈঠকি আলাপ-আলোচনা এমন কি লিফলেট ছেপে বিলি করার মাধ্যমে তিনি অব্যাহতভাবে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই সমাজে একজন চিন্তাশীল ও বিবেকবান মানুষ, যিনি কোনো দল বা রাজনীতি করেন না, যাঁর নিজস্ব তেমন অর্থবল নেই, কোনোদিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক আনুকূল্য পাওয়ার সম্ভাবনাও যাঁর নেই, তিনি কেবল এভাবেই তাঁর দায়িত্ব পালন করতে পারেন। আমাকে এবং নিশ্চয় আরও বহুজনকে অনেকবার এই কথাটা বলেছেন তিনি।

দীপন তাঁর বাবার মতো লেখক হয় নি; কিন্তু তার প্রকাশক হওয়ার পেছনেও হয়তো অনুরূপ কোনো দায়বোধ কিংবা তার বাবারই অনুপ্রেরণা কাজ করেছিল। বাবার মতোই মননের রাজ্যেই সে বিচরণ করতে চেয়েছিল। না হলে ব্যবসা হিসেবে প্রকাশনা এখনও এদেশে খুব লাভজনক বা সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র নয়। অন্তত দীপনের মতো মানুষের জন্য তো নয়ই। তারপরও সকল প্রতিকূলতা উজিয়ে শুধু আপন মেধা, শ্রম, নিষ্ঠা ও সৃজনশীলতা দিয়ে অল্প কয়েক বছরেই সে দেশের সেরা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সারিতে ‘জাগৃতি’কে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর তালিকায় চোখ বুলালে যে কেউ তার রুচিবোধ ও মননশীলতার পরিচয় পাবেন। সেই সঙ্গে এই অল্প বয়সেই নিজেকে সে আমাদের প্রকাশনা জগতের নেতৃস্থানীয় একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রকাশনা জগতের স্বার্থরক্ষায় তাঁর ভূমিকা; তার বিনয়, সৌজন্যবোধ, কর্তব্যপরায়ণতা, সহমর্মিতা, দৃঢ়তা ইত্যাদি গুণাবলির কথা তার জীবিতকালে যেমন, তেমনি মৃত্যুর পরও গত ক’দিনে তার সতীর্থদের কারো কারো কাছ থেকে শুনেছি। প্রতিবারই মনে হয়েছে, নিজের স্বভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে হলেও, কেন আমি যেচে এমন একটি উদ্যোগী ও উদ্যমী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলাম না।

দীপনকে যেদিন হত্যা করা হয়, তার কয়েকদিন আগে শাহবাগ আজিজ মার্কেটের নিচতলায় স্যারের সঙ্গে দেখা হতে বরাবরের মতোই তিনি আমাকে এই সময়ে আমরা যারা সমাজের অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন, দলবাজির বাইরে থেকে সুস্থ চিন্তা করতে চাই, অবস্থা উত্তরণের এবং সে লক্ষ্যে নিজ দায়িত্ব পালনের তাগিদ অনুভব করি, তাদের করণীয় সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন। ব্যস্ততা থাকায় সেদিন আমি তাঁকে সময় দিতে পারি নি। শনিবার সন্ধ্যায় এক বন্ধুর ফোনেই প্রথম আমি দীপনের হত্যাকা-ের খবর জানতে পারি। এরপর আরও অনেকেই আমাকে বিশদ জানিয়ে ও জানতে চেয়ে ফোন করেন। সেদিন রাতে কিন্তু আমি টেলিভিশনের সামনে বসতে পারি নি। পাছে টিভির পর্দায় পুত্র শোকাতুর স্যারের ভেঙেপড়া চেহারা দেখতে হয়, এই আশঙ্কায়। কেবলই মনে হচ্ছিল, এত বড় শোক সামলে তিনি কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াবেন। তখনও আমার জানা ছিল না, বন্ধ ঘরের দরোজা খুলে পুত্রের গলাকাটা লাশ পিতাকেই প্রথম আবিষ্কার করতে হয়েছে। যে-সমাজে বা রাষ্ট্রে এমন ব্যাপার ঘটতে পারে, সেখানে সবকিছু ঠিকমতো চলছে বলে যদি কেউ দাবি করেন, তিনি যত উচ্চ পদ-পদবি বা ডিগ্রিরই অধিকারী হোন, তাঁকে চক্ষুষ্মান অন্ধ কিংবা ক্ষমতামদমাতাল বা স্বার্থান্ধ জ্ঞানপাপী ছাড়া আর কী বলা যাবে? জীবনানন্দ তাঁর ‘অদ্ভুত আঁধার’ কবিতায় (বোধ করি স্যারেরও খুব প্রিয় কবিতা এটি) এইসব অন্ধ ক্ষমতাগর্বীর প্রতি ইঙ্গিত করেই তো বলেছেন, ‘যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা’। কিন্তু পরদিন খবরের কাগজে স্যারের বক্তব্য পড়ে ও ছবি দেখে এবং পরে টেলিভিশনেও তার পুনঃপ্রচার দেখে ও শুনে মনে হলো, মানুষের যুক্তি ও বিবেচনাবোধের কাছে বর্বরতার শক্তি পরাজিত হয়েছে। পুত্রের লাশের সামনে দাঁড়িয়ে একজন সাহসী মানুষের দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারিত কয়েকটিমাত্র সংযত বাক্য ইতিহাসের এক অমোঘ বাণী হয়ে দেখা দিয়েছে : ‘সবার, সব পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক।’ যারা এদেশে ধর্মের নামে রাজনীতি করছে এবং যারা ধর্মনিরপেক্ষতার নাম করে রাজনীতি করছে উভয় পক্ষেরই শুভবুদ্ধি কামনা করেছেন তিনি। বলেছেন, ‘কার বিরুদ্ধে অভিযোগ করব? কার কাছে বিচার চাইব?’ তাঁর মতে সমস্যাটা রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত। সুতরাং সে সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত, সমাজে প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বিচার পাওয়ার আশা বৃথা। চাইলেও পাওয়া যাবে না। অতীতে যেমন এরকম কোনো হত্যাকা-েই পাওয়া যায় নি, ভবিষ্যতেও পাওয়া যাবে না। ইতিহাস এভাবেই কখনো কখনো কোনো বিশেষ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষ মানুষের কণ্ঠে কথা বলে ওঠে। জাতি বা জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের পথনির্দেশ দেয়।

এই কলামে আমি প্রধানত রাজনৈতিক বিষয় নিয়েই লিখে থাকি। কিন্তু আজ আমি রাজনীতির কথা বিশেষ বলব না বলেই মনস্থির করেছি। কারণ আমরা যাকে রাজনীতি বলি, তার প্রতি দেশের ব্যাপক মানুষের, যাদের মধ্যে বিবেক ও সংবেদনশীলতার লেশমাত্র আছে, বিরাগ ও বিবমিষা ইতিমধ্যে চরমে পৌঁছেছে। তথাকথিত রাজনীতিক এবং তাঁদের অনুগ্রহজীবী কিছু বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিজন হয়তো জানেন না, রাজনীতি বিষয়টাকে তাঁরা আজ কোন পাঁকে নামিয়েছেন। কিংবা হয়তো জেনেবুঝেই তাঁরা এটা করছেন। একদা যা ছিল সামরিক একনায়কদের এজেন্ডা, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব এখন তাঁরা নিয়েছেন। দীপনকে হত্যা এবং আরও এক প্রকাশক ও দুজন লেখককে (তাঁদের কেউ কেউ ব্লগে লেখেন বটে; কিন্তু তাঁদেরকে আমি লেখকই বলতে চাই) হত্যা প্রচেষ্টার পর এ-সম্পর্কে সরকারি মহলের বক্তব্য-বিবৃতি থেকে জনমনে তেমন ধারণাই আরও দৃঢ়মূল হবে। মাহবুবউল আলম হানিফ নাকি পরে তাঁর বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে দুঃখ প্রকাশই কি যথেষ্ট? তাছাড়া এমন দায়িত্বহীন ও অশালীন উক্তি তো তিনি একাই করেন না। যে-কোনো ইস্যুতে বা উপলক্ষে অন্যের ওপর দোষারোপ, পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি এবং দায়িত্বহীন ও বেসামাল উক্তির যে সংস্কৃতি এদেশে গড়ে তোলা হয়েছে, তাতে সবারই চেষ্টা থাকে কে কাকে ছাড়িয়ে যেতে পারেন। কী জানি, এভাবে হয়তো নেতৃত্বের দৃষ্টি আকর্ষণ সহজ হয়। তবু ভালো যে, আমাদের বর্তমান ও সাবেক দুই আইনমন্ত্রী দীপনের বাবার বক্তব্যে ‘আবেগ ও বাস্তবতাবোধে’র সন্ধান পেয়েছেন। অবশ্য তাঁরা শিক্ষিত সজ্জন লোক, পেশাদার রাজনীতিক নন। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পর্কে মাহবুবউল আলম হানিফের ধারণা থাকবে এমন আশা আমরা করি না। কিন্তু তাঁর দলে নিশ্চয় এমন কিছু লোক আছেন খবরের কাগজ ছাড়াও অন্য কিছু পড়ার অভ্যাস যাঁদের আছে। হয়তো তাঁদের কেউ কেউ তাঁর ছাত্র কিংবা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এবং ইদানীং টিভি টকশোতেও তাঁর বক্তব্য শোনার সুযোগ তাঁদের হয়েছে। সেই সূত্রে এই অনুচ্চকণ্ঠ ও নির্বিবাদী সমাজচিন্তকের ‘মতাদর্শে’র সঙ্গে সামান্য হলেও যাঁদের পরিচয় আছে। দলের মুখপাত্র হিসেবে যাঁকে কথা বলতে হয়, তিনি সদ্যপুত্রহারা একজন পিতা সম্পর্কে অমন অনুমানভিত্তিক একটি মন্তব্য করার আগে দলীয় সহকর্মীদের কাছে এ ব্যাপারে একটু খোঁজখবর নিতে পারতেন।

অধ্যাপক ফজলুল হক যদি এই সরকারের কাছে তাঁর পুত্রহত্যার বিচার আশা করেন না, এমন কথাও বলতেন (যদিও তিনি কথাটা সেভাবে বা সে-অর্থে বলেন নি), তাতে এমন কি ভুল বা অন্যায় হতো? নারায়ণগঞ্জের মেধাবী কিশোর ত্বকির বাবা রফিউর রাব্বি তো দিনের পর দিন তাঁর পুত্রহত্যার বিচার চেয়ে আসছেন। ত্বকি তো তথাকথিত ব্লগারও ছিল না। তার হত্যাকা-ের সঙ্গে কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী, জামায়াত-শিবির বা বিএনপি জড়িত বলেও এ পর্যন্ত কেউ অভিযোগ করে নি। অন্যদিকে রফিউর রাব্বি একজন সংস্কৃতিজন, স্বাধীনতার চেতনার পক্ষের মানুষ হিসেবে সুপরিচিত। নারায়ণগঞ্জের সরকারদলীয় মেয়রসহ সারা দেশের স্বাধীনতার চেতনার পক্ষের মানুষ ত্বকি হত্যার বিচার দাবিতে তাঁর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। নানা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে, এখনও নিয়ে চলেছে। কিন্তু তাতে ত্বকি হত্যার বিচারের কোনো সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে কি? বরং এই বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো রফিউর রাব্বিকে সেখানকার একজন প্রতাপশালী সরকারদলীয় এমপি ও তাঁর সমর্থকদের হুমকি-ধামকি ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়েছে। ত্বকি হত্যার সঙ্গে উক্ত এমপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকার পরও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মানুযায়ী কোনোদিন তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে শুনি নি। যদিও, সরকারও বলে, আইন সবার জন্য এক। উল্টো দেশের প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর পক্ষে কথা বলেছেন। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনে তিনি সাংসদ হয়ে এসেছেন।

বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তাঁর সমসাময়িক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে যতোটা শুনেছি, তাঁদের স্মৃতিচারণ ও তাঁর নিজের স্মৃতিকথা পড়েও যতোটা জেনেছি-বুঝেছি, তাতে তিনি বিদ্বান ও গুণীজনদের সম্মানদানের ব্যাপারে ছিলেন অকুণ্ঠ। তেমন লোক ভিন্ন দল বা মতাদর্শের অনুসারী হলেও, তিনি তাঁদের সমাদর করতেন। স্বাধীনতার পরেও নানাজনের প্রতি আচরণে তাঁর এই গুণগ্রাহিতার প্রমাণ পাওয়া যায়। এখানে এ নিয়ে বিশদ আলোচনা বা উদাহরণের সুযোগ নেই। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনসহ তাঁর সহকর্মীরা এই গুণটি পেয়েছিলেন, বলা বাহুল্য, যে পরিবেশে তাঁদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা বা বিকাশ ঘটেছিল তার এবং যেসব বিশাল ব্যক্তিত্বের সাহচর্যে তাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু-উত্তর আজকের আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ও কর্মীর এই প্রশিক্ষণের সুযোগ হয় নি। বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর বেলায়ও কথাটা সমভাবে প্রযোজ্য। আজকের রাজনৈতিক নেতৃত্বগুণ বলতে বোঝেন কেবল তোষামোদ দক্ষতা ও চাটুকারিতাকে। আর সেক্ষেত্রেও তাঁদের চাহিদা শতভাগ আনুগত্য, আটানব্বই বা নিরানব্বই ভাগ হলেও তাঁদের মন ভরে না। দলের ভেতরে কারো মধ্যে সেই প্রতিভার কিছু কমতি দেখলে, তিনি যত বিদ্বান বা গুণীই হন, কিংবা তাঁর অন্যান্য যোগ্যতা যাই থাক, তাঁকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করতে এবং শেষে দল থেকে বিতাড়িত করতে কোনো উপায়ই বাদ রাখা হয় না। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই অতীতে তেমন দৃষ্টান্ত রেখেছে। দলের বাইরে বিদ্বান, প-িত, লেখক-শিল্পীদের মধ্যেও তাঁরা সে তোষামোদ-প্রতিভাই খোঁজেন। আর এক্ষেত্রে সরবরাহটাও বর্তমানে আগের চেয়ে বেশি, ফলে তাঁদের সমস্যায় পড়তে হয় না। পঁচাত্তরে একদলীয় বাকশাল শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর সাংবাদিক-লেখক-বুদ্ধিজীবীরা যখন লাইন দিয়ে ও হুড়োহুড়ি করে বাকশালে যোগ দিচ্ছিলেন, তখনও আবুল ফজল ও সুফিয়া কামালের মতো কেউ কেউ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধ সত্ত্বেও বাকশালে যোগ দিতে রাজি হন নি। সেদিন বাকশালে যোগ দেন নি আবু জাফর শামসুদ্দিন, আহমদ শরিফ, শামসুর রহমান, নির্মল সেনসহ আরও অনেকেই। কিন্তু সেজন্য সেদিন তাঁদের কাউকে পদ-পদবি বা চাকরি হারাতে হয় নি। কর্মীদের দ্বারা অপদস্থ বা লাঞ্ছিত হতে হয় নি। অশালীন মন্তব্য বা বিদ্রƒপেরও শিকার হতে হয় নি। এমনও শোনা যায়, সেদিন অন্য সব পত্রিকা বন্ধ করে দেশে যখন চারটি মাত্র সংবাদপত্র চালু রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, তার একটি ‘বাংলাদেশ টাইমস’-এর সম্পাদক পদের জন্য এনায়েতুল্লাহ খানের কথা ভাবা হয়েছিল। আজকের দিনে এমনটা আশা করা যায় কি? আমাদের সরকারপন্থী বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকরা এ ব্যাপারে একটা যুক্তি দিয়ে থাকেন। তাঁদের মতে, পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর দেশের দ্বিধাবিভক্তি একটি বাস্তবতা, সুতরাং সেভাবেই বিষয়টাকে দেখতে হবে। তাঁদের তত্ত্ব অনুযায়ী স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু উদারতা ও সহনশীলতার পথ গ্রহণ করে ভুল করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর জন্যও নাকি সেটাই দায়ী। সত্যিই কি তাই? এ নিয়ে হয়তো অন্য কোনোদিন আলোচনা করা যাবে। তবে যাঁরা এ ধরনের তত্ত্বের জোগান দিচ্ছেন, খোঁজ নিলে দেখা যাবে তাঁদের অনেকেই এককালের বাম রাজনীতির অনুসারী। চেতনাগতভাবেই বহুদলীয় ব্যবস্থায় ও বহুমতের অস্তিত্বে তাঁরা বিশ্বাসী নন। অবাধ নির্বাচনে ভোটে জিতে এমপি বা মন্ত্রী হতে পারবেন, এমন সম্ভাবনা তাঁদের নেই বললেই চলে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশের এই বড় দুই দলে যাঁরা সত্যি সত্যি গণতন্ত্র ও জনমতের শক্তিতে আস্থা রাখেন, দল ও দেশের স্বার্থেই তাঁদেরকে এঁদের সম্পর্কে সাবধান থাকতে হবে। এরকম বিশ্বাস থেকে স্বাধীনতার পর একবার এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের পর একবার, কিছু লোক লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীদের কালো তালিকা প্রণয়নের উৎসবে মেতেছিলেন। সবসময় সংকীর্ণ ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থেই এ ধরনের কাজ করা হয়ে থাকে। দেশ ও জাতি তাতে কোনোভাবেই লাভবান হয় না। এদেশের অতীত ইতিহাস ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা সে শিক্ষা নিতে পারি। মোট কথা, পরমতসহিষ্ণুতা, বিবেচনা বুদ্ধি এবং সংযম ও সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই। যদি আমরা এদেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ কামনা করি ও তা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আন্তরিক হই। রাজনীতি নিয়ে কথা বলব না বলেও শেষ পর্যন্ত রাজনীতির কথায় এসে পড়তে হল। কারণ দেশে আজ রাজনীতির নামে যা চলছে তা অপরাজনীতি। ক্ষমতায় যাঁরা আছেন ও ক্ষমতায় যাঁরা যেতে চান, তাঁরা কেউ একটা কথা বুঝতে পারছেন না, মনে রাখছেন না। তা হলো, সমাজে যদি গণতন্ত্রের চর্চা ব্যাহত হয়, বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং আইনের শাসন বা ন্যায়বিচারের পথ রুদ্ধ হয়, বৈষম্য ও বঞ্চনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে, পরমতসহিষ্ণুতার অভাব ঘটে, তবে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই চরমপন্থা বা জঙ্গিবাদ শেকড় গাড়ার সুযোগ পায়। সমাজের সংবেদনশীল অংশ বিশেষ করে তরুণরা সেক্ষেত্রে চরমপন্থী বা জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়। তা সে ডান বা বাম যে ধারারই হোক না কেন। আজ ক্ষমতার রাজনীতির স্বার্থে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের একটি জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা বা তার গোপন সহায়তা করছে। অন্য দলটিও তাদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার কাজে সে জঙ্গি আতঙ্ককে ব্যবহার এবং সে প্রয়োজন থেকে এ ব্যাপারে এক রকম প্রশ্রয় বা নমনীয়তার নীতি অনুসরণ করছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে মানুষ জেনেবুঝে কার কাছে ন্যায়বিচার আশা করবে?

দীপন কথাটার আভিধানিক অর্থ দুটি : আলোকিত করা এবং উদ্দীপ্ত করা। দীপন তার নামটা সার্থক করতে আমাদের চেতনালোকে সেই আলো ছড়ানো ও উদ্দীপন ঘটানোর কাজটাই বেছে নিয়েছিল। তার ঘাতকরা, যে নাম-পরিচয়েই তারা সংগঠিত হোক, নিশ্চিতভাবে অন্ধকারেরই শক্তি। অন্ধকারের প্রতিনিধি হিসেবে তারা চেয়েছে সে দীপ শিখাটিকে চিরতরে নিভিয়ে দিতে। কিন্তু প্রদীপের গড়িয়ে পড়া শোণিতে প্রাণের সলিতা ভিজিয়ে নিয়ে হাজার প্রদীপ জ্বলে ওঠার সময় আজ সমাগত। দীপনের মৃত্যু-পরবর্তী গত কদিনের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ দেয়। সে হাজার প্রদীপের আলোয় প্রকাশ্য ও ছদ্মবেশী গণশত্রুদের চিনতে আশা করি আমাদের ভুল হবে না। দীপন ও তাঁর মতো অন্যরা আমাদের মুক্তবুদ্ধিচর্চার শহীদ। আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার-স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের সঙ্গে তাঁদেরকেও আমরা স্মরণ করব, শ্রদ্ধায়. কৃতজ্ঞতায়। দীপনের মতো একই দিনে একই ধরনের হামলায় আহত অপর প্রকাশক শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ টুটুলের ভাষায় বলব, হাজার বছরের মুক্তবুদ্ধি চর্চার যে ঐতিহ্য আছে বাংলাদেশের, তা বিকাশের কাজে কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। না, বিচার না পাওয়ার হতাশা বা ক্ষোভ থেকে আমরা আর বইয়ে আগুন ধরাবো না। কারণ সেটা অন্ধকারের শক্তিরই পক্ষে যায়। বরং হাজার হাজার বইয়ের অক্ষর থেকে ঠিকরে পড়া যে আলো তাই আমাদেরকে অন্ধকারের প্রাকার ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

দীপনের সন্তান তার পিতাকে, স্ত্রী তার স্বামীকে, বাবা-মা তাঁদের পুত্রকে আর কোনোদিনই ফিরে পাবেন না। আমাদের কোনো সান্ত¡না বা সমবেদনাই তাঁদের শোককে প্রশমিত করতে পারবে না। স্বজন হারানোর এই বেদনা তাঁদেরকে সারা জীবনই বয়ে বেড়াতে হবে। তারপরও বলব, মানুষ শেষ পর্যন্ত মরণশীল; কিন্তু তার চেতনার, স্বপ্নের মৃত্যু নেই। দীপনের স্বপ্নের যে প্রতিষ্ঠান জাগৃতি, তা টিকে থাক, তার মধ্য দিয়ে তাঁর পিতা ও তার নিজের মুক্তবুদ্ধি চর্চার সাধনাটি এগিয়ে যাক, এই কামনা করি। আর এ কাজে সমর্থন ও সহায়তার হাত বাড়ানোই হবে এ মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় কর্তব্য।

হাসান শফি : লেখক ও চিন্তক

morshedshasan@gmail.com

সৌজন্যে : আলোকিত বাংলাদেশ




Leave a Reply

Your email address will not be published.