Search
Wednesday 18 May 2022
  • :
  • :

টার্গেট কিলিং, চাপে পুলিশ

টার্গেট কিলিং, চাপে পুলিশ

ঢাকা : দেশে টার্গেট কিলিং ও সন্ত্রাসী হামলা চলছেই। ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কূটনীতিকপাড়ায় ইতালীয় নাগরিক তাভেল্লা সিজারকে হত্যার মাধ্যমে এই ভয়াবহ অপরাধের সূত্রপাত ঘটায় ঘাতকচক্র। সর্বশেষ গতকাল ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারে ঘাতকচক্রের হাতে প্রাণ গেছে চেকপোস্টে কর্তব্যরত এক পুলিশ কনস্টেবলের। ২৮ সেপ্টেম্বর  থেকে গতকাল পর্যন্ত ৩৬ দিনে ২ বিদেশি হত্যাসহ দেশের ভেতর ১০টি বড় সন্ত্রাসী হামলা ও খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে পুলিশ ৩টি ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত রহস্য উদঘাটন ও আসামি গ্রেপ্তার করেছে। বাকি ৭টি ঘটনার রহস্য এখনো উদঘাটিত হয়নি। একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দাদেরও ঘাম ছুটেছে। এসব ঘটনা তটস্থ করে তুলেছে সরকারকেও।

এদিকে পুলিশ চেকপোস্টে পৃথক ২ পুলিশ সদস্যকে খুন করার ঘটনায় চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ সময় যেকোনো ধরনের অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে পুলিশকে ‘অনগার্ড’ থেকে দায়িত্ব পালন করতে গতকাল নতুন করে নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাছাড়া চেকপোস্টে অধিক পরিমাণ জনবল নিয়োগ করতে বলা হয়েছে, যাতে আক্রমণ এলে তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দেওয়া যায়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দুই বিদেশিসহ একের পর এক হত্যার ঘটনায় গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছে। সাভারে পুলিশ কনস্টেবল হত্যা এই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যার প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটনে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

হঠাৎ করে দেশে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যার ঘটনায় র‌্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দাদের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়ছে। প্রতিটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছে। সন্ত্রাসমূলক অপতৎপরতা রোধে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হচ্ছে নানা স্থানে। রাজধানীতে গুরুত্বপূর্ণ সব স্থানেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহলসহ অন্যান্য নজরদারি। কিন্তু এতসব নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যেই একের পর এক নাশকতামূলক ঘটনা ঘটছে। চলছে টার্গেট কিলিং।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেছেন, সব সময় টার্গেট কিলিং ঠেকানো অসম্ভব। তারপরও আমাদের চেষ্টা রয়েছে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। এজন্য নানা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কিছু কিছু ঘটনায় টার্গেট কিলিং ঠেকিয়েও দেওয়া হয়েছে নিকট অতীতে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবেই একের পর এক নাশকতামূলক ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। আর মনোবল ভাঙতে পুলিশের ওপর হামলা করা হচ্ছে। সামনে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা গোয়েন্দাদের। কিন্তু একের পর এক হত্যা কারা করছে? ধরা পড়ছে না কেন? এ প্রশ্ন জনমনে বারবার ঘুরেফিরে আসছে। বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় হত্যা, সাভারে ব্লগার আশরাফুল হত্যা, খিলগাঁওয়ে ব্লগার নীলাদ্রি নীলয় হত্যা, গোপীবাগে ৬ খুন, মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাসহ আরও বেশ কয়েকটি ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। জড়িতরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই সব ঘটনায় জড়িত আসামিরা ধরা না পড়ায় ফের ব্লগার হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, ঘরে-বাইরে বিদেশি নাগরিকসহ বিভিন্ন মানুষ খুন হচ্ছেন। এসব ঘটনার তদন্ত পুলিশ করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন পুলিশের ওপর হামলা হচ্ছে। তাহলে কার নিরাপত্তা কে দেবে?

তিনি আরও বলেন, আশুলিয়ায় সন্ত্রাসী হামলার সময় অন্যান্য পুলিশ সদস্যরা কী করছিল। তারা কেউ বাধা দিতে আসেনি কেন। এসব বিষয়েও পুলিশকে তদন্ত করতে হবে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোন সদস্য কোথায় দায়িত্বে রয়েছেন, কীভাবে কাজ করছেন সেটাও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় গুলশানে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তাভেল্লা সিজার নিহত হন। ওই ঘটনার রেশ না কাটতেই মাত্র পাঁচদিনের মাথায় ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাভেল্লা সিজার হত্যাকা-ে ৪ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তবে হোশি খুনের ব্যাপারে এখনো পর্যন্ত পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।

ওই দুটি ঘটনার পর বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে সর্বত্র আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইতে থাকে। এমনকি গুলশানের কূটনীতিকপাড়ার মতো নিশ্চিদ্র নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে কীভাবে তাভেল্লা খুন হলেন তা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলে। এসব ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ পশ্চিমা ও তাদের কয়েকটি বন্ধু রাষ্ট্র এদেশে তাদের দেশের নাগরিকদের চলাফেরায় নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ এনে সর্তকতা জারি করে। নতুন করে বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের ভ্রমণের ক্ষেত্রেও সমান সতর্কতা জারি করে প্রভাবশালী দেশগুলো। কয়েকটি রাষ্ট্র এখনো তাদের সতর্কতা বলবৎ রেখেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারকে বিদেশি নাগরিকসহ একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ও টার্গেট কিলিংয়ের ঘটনা দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের গ্রেপ্তার করতে চাপ দেওয়া হচ্ছে।
গত ৫ অক্টোবর সকালে একই স্টাইলে পাবনার ঈশ্বরদীতে ফেইথ বাইবেল চার্চের ভাড়া বাসায় ঢুকে ৩ যুবক যাজক লুক সরকারকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা করে। ওই ঘটনায় পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও ঢাকা থেকে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে জেএমবির ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই দিন সন্ধ্যায় রাজধানীর মধ্যবাড্ডার একটি বাসায় গলা কেটে হত্যা করা হয় রহমতিয়া খানকা শরিফের পীর খিজির খানকে। এ ঘটনায় জড়িতরা ধরা পড়েছে। আদালতে দায় স্বীকার করে দিয়েছে জবানবন্দি।

২২ অক্টোবর রাতে রাজধানীর গাবতলীতে চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকালে সন্ত্রাসীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান পুলিশের এএসআই ইব্রাহিম মোল্লা। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে।
২৩ অক্টোবর পুরনো ঢাকার হোসেনি দালানে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে বোমা হামলায় এক শিশু নিহত ও অন্তত দেড়শ মানুষ আহত হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও একজন নিহন হন। এখনো এ ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

৩১ অক্টোবর দুপুরে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় জাগৃতি প্রকাশনের কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে। একই সময় মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর প্রকাশনের কর্ণধার আহমেদুর রশীদ টুটুলকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়। এসব ঘটনায় এখনো কেউ ধরা পড়েনি।

গতকাল বুধবার সাভারের আশুলিয়ার বাড়ইপাড়ায় শিল্প পুলিশের কনস্টেবল মুকুল হোসেনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয় পুুলিশ চেকপোস্টে। এ ঘটনায় নূর আলম নামে আরও একজন আহত হন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।

এর আগে মঙ্গলবার রাতে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ঘাটুরা এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে যায়। এতে পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছেন। -আমাদের সময়




Leave a Reply

Your email address will not be published.