Search
Wednesday 18 May 2022
  • :
  • :

চলে গেলেন আপোশবিহীন কর্মবীর হেলমুট স্মিট

চলে গেলেন আপোশবিহীন কর্মবীর হেলমুট স্মিট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : জার্মানদের কাছে তিনি ছিলেন দক্ষ চ্যান্সেলর ও সুচতুর রাজনীতিক৷ বহির্বিশ্ব হেলমুট স্মিটকে বিশেষ করে অর্থনীতির প্রশ্নে বোদ্ধা বলে গণ্য করত৷ ৯৬ বছর বয়সে পরলোকগমন করলেন হেলমুট স্মিট৷

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ছিলেন স্পষ্ট কথার মানুষ৷ তা সত্ত্বেও তিনি যতটা শ্রদ্ধা পেয়েছেন, তা খুব কম মানুষেই পায়৷ আধুনিক জার্মানির ইতিহাসে সর্বাধিক জনপ্রিয় রাজনীতিক হিসেব বারংবার নির্বাচিত হয়েছেন হেলমুট স্মিট – তাঁর কাঠখোট্টা, সবজান্তা হাবভাব সত্ত্বেও৷

কাউকে রেয়াত করে কথা বলতেন না স্মিট৷ ইউরোপের ঋণসংকট যখন তুঙ্গে, তখন তাঁকে চ্যান্সেলর ম্যার্কেলের ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ সম্পর্কে একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলতে শোনা গেছে: ‘‘ও’ প্রশ্নের কোনো কূটনীতিকসুলভ উত্তর দেবার আগে আমাকে অনেকটা ভাবতে হবে৷”

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিকাশ, জার্মানিতে একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজ গঠন বা আফগানিস্তানে জার্মান সৈন্য পাঠানোর ব্যাপারে তাঁর বিরূপ মতামত সত্ত্বেও জার্মান জনগণের কাছে তাঁর ভাবমূর্তি অমলিন থেকেছে৷

আপোশবিহীন
বহু জার্মানের কাছে হেলমুট স্মিট হলেন সেই রাজনীতিক, যিনি ১৯৭৭ সালের হেমন্তে আরএএফ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দ্বিধা ও সংশয়হীনভাবে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন৷ শিল্পপতি সমিতির প্রেসিডেন্ট হান্স-মার্টিন শ্লায়ার-এর অপহরণ, এবং সোমালিয়ায় রাজধানী মোগাদিশু-তে লুফৎহানসার ‘‘লান্ডসহুট” বিমানটির অপহরণ: উভয় ক্ষেত্রেই সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য ছিল, পণ হিসেবে অপরাপর আরএএফ সন্ত্রাসীদের সরকারি কারাগার থেকে মুক্ত করা৷ হেলমুট স্মিট কিন্তু অনড় থাকেন এবং পরে বলেন যে, তিনি তাঁর রাষ্ট্রের নাগরিকদের বিপদ থেকে রক্ষা করার ক্ষমতা প্রদর্শন করতে চেয়েছিলেন৷

রাজনীতিক
জন্মের শহর হামবুর্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীনই হেলমুট স্মিট ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দেন৷ ১৯৬২ সালে সাগরের বান এসে যখন হামবুর্গ শহরকে ভাসিয়ে দিচ্ছে, তখন স্মিট বিনা দ্বিধায় সেনাবাহিনী নিয়োগ করেন৷

১৯৬৪ সালে স্মিট এসপিডি দলের সংসদীয় গোষ্ঠীর নেতা নির্বাচিত হন৷ এসপিডি এবং এফডিপি দলের মধ্যে প্রথম জোট সরকার গঠিত হওয়ার পর তৎকালীন চ্যান্সেলর ভিলি ব্রান্ট ১৯৬৯ সালে স্মিট-কে প্রতিক্ষামন্ত্রী পদে মনোনীত করেন৷ ১৯৭৪ সালে ব্রান্ট একটি গুপ্তচর কেলেঙ্কারির দরুণ পদত্যাগ করতে বাধ্য হলে, স্মিট যেন স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই ব্রান্ট-এর উত্তরসূরি নির্বাচিত হন৷

কর্মবীর
স্মিট-কে জার্মানরা বলতেন ‘‘মাখার”, অর্থাৎ ‘করিয়ে’ মানুষ৷ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামে – উদাহরণ: মোগাদিশু – অথবা অর্থনীতির প্রশ্নে, স্মিট আপোশ করতে জানতেন না৷ জার্মানির অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কোনো বুনিয়াদি পরিবর্তন আনতে পারেননি তিনি, তবুও তাঁর ‘‘বিশ্বঅর্থনীতিবিদ” হিসেবে খ্যাতি ছিল৷ ১৯৭৬ এবং ১৯৮০, দু’টি সংসদীয় নির্বাচনে তিনি বিজয়ী হতে পেরেছেন, প্রধানত দেশবাসীর তাঁর উপর অসীম আস্থার কারণে৷

সামাজিক গণতন্ত্রী
নিজের দল এসপিডি-র সঙ্গে স্মিট-এর সম্পর্ক চিরকালই কিছুটা সমস্যাকর৷ স্মিট-কে চিরকালই কিছুটা দক্ষিণঘেঁষা সামাজিক গণতন্ত্রী বলে গণ্য করা হতো; প্রয়োজনে দলীয় সম্মলনের প্রস্তাবাবলীর তোয়াক্কা করতেন না তিনি৷ সত্তরের দশকের শেষে, আশির দশকের সূচনায় ফেডারাল জার্মান প্রজাতন্ত্রে আরো মার্কিন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা নিয়ে যে ঝড় বয়ে যায়, জার্মান-অ্যামেরিকান মৈত্রীর প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত হেলমুট স্মিট তা বিশেষভাবে সমর্থন করেন৷ ১৯৮২ সালে স্মিট চ্যান্সেলর পদ থেকে বিদায় নেওয়ার পর পরই এসপিডি দল স্মিট আমলের নীতি পরিবর্তন করে৷

যখন একা
রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে স্মিট ‘‘ডি সাইট” সাপ্তাহিকের যুগ্ম প্রকাশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন৷ এছাড়া সারা বিশ্বে রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা বিষয় নিয়ে ভাষণ দিয়ে বেড়াতেন৷ এসপিডি দলের নতুন নেতৃবর্গের সঙ্গে তাঁর বিশেষ ঘনিষ্ঠতা দেখা যায়নি – একমাত্র সাবেক চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়ডার-এর জন্য তিনি ১৯৯৮ সালের নির্বাচনি প্রচার অভিযানে সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন৷ এছাড়া ২০১১ সালে এসপিডি-র চ্যান্সেলর পদপ্রার্থী পেয়ার স্টাইনব্রুক সম্পর্কে স্মিট-এর মন্তব্য কিংবদন্তি হয়ে রয়েছে: ‘‘ডেয়ার কান এস”, অর্থাৎ ‘ও পারবে’৷ স্টাইনব্রুক ছিলেন স্মিট-এর দাবা খেলার সঙ্গী৷

তবে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তিনি যে মনেপ্রাণে একজন সামাজিক গণতন্ত্রী ছিলেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই৷




Leave a Reply

Your email address will not be published.