Search
Wednesday 21 August 2019
  • :
  • :

কিরনজিৎ আলুওয়ালিয়া: যে নারী স্বামীর গায়ে আগুন দিয়েছিলেন

কিরনজিৎ আলুওয়ালিয়া: যে নারী স্বামীর গায়ে আগুন দিয়েছিলেন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ৫ এপ্রিল : দিনটা ছিল এক বসন্তের সন্ধ্যা- ১৯৮৯ সাল। দীপক আলুওয়ালিয়া তার স্ত্রীর চুলের মুঠি শক্ত হাতে ধরে গরম ইস্ত্রিটা চেপে ধরেছিলেন তার মুখে।

স্বামীর হাতের মুঠি আলগা করার চেষ্টায় ছটফট করছিলেন কিরনজিৎ। কিন্তু এর মধ্যে তার মুখের চামড়া পুড়ে গেছে। দাগ হয়ে গেছে তার মুখে।

কিরনজিৎ আলুওয়ালিয়া বলেছেন বছর দশেক স্বামীর অত্যাচার সহ্য করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেদিনের ঘটনা তাকে সহ্যের সীমায় ঠেলে দিয়েছিল।

”আমি ঘুমতে পারছিলাম না। আমি কান্না থামাতে পারছিলাম না। প্রচণ্ড শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা,” ঘটনার তিরিশ বছর পর বিবিসিকে বললেন কিরনজিৎ আলুওয়ালিয়া।

“আমি ওকে আঘাত করতে চেয়েছিলাম, ঠিক যেভাবে ও আমাকে আঘাত করেছে, সেইভাবে। আমি চেয়েছিলাম আমার কি ধরনের যন্ত্রণা হচ্ছে তা সে-ও বুঝুক। এর বাইরে ভাবার ক্ষমতা তখন আমার ছিল না। আমার মাথা তখন একেবারেই কাজ করছিল না।”

সে রাতে যখন কিরনজিতের স্বামী বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন, তখন স্বামীর পায়ের ওপর পেট্রল ঢেলে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দেন কিরনজিৎ। তারপর ছেলেকে তুলে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালান তিনি।

”আমার মনে হয়েছিল, তার পা দুটো পুড়ে গেলে সে আমাকে পিছু ধাওয়া করতে পারবে না। আর তার পায়ে যদি আমি ক্ষত করে দিতে পারি, তার চিরকাল মনে থাকবে স্ত্রী কীভাবে তাকে সাজা দিয়েছিল। কাজেই সে যখনই তার পায়ের ক্ষত দেখবে, তার আমার কথা মনে হবে।”

কিরনজিৎ জোর দিয়ে বলেন তিনি কখনই তার স্বামীকে খুন করতে চাননি।

কিন্তু ১০ দিন পর পায়ের আঘাত থেকে দীপক মারা যান।

সেবছর ডিসেম্বর মাসে কিরনজিৎ খুনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

তার যখন বয়স ১৬ তখন বাবা মা দুজনকেই হারান তিনি। কিন্তু তার শৈশব কেটেছে আদরে। তার নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তার বড় ভাই ও বোনেরা তাকে খুবই স্নেহ করতেন, বলেন কিরনজিৎ।

তবে কিরনজিতের বয়স বিশের কোঠায় পৌঁছনর আগেই বিয়ে করার জন্য তার ওপর চাপ বাড়তে থাকে।

”আমি কখনই বিয়ে করতে চাইনি। তাই আমি ক্যানাডায় আমার এক বোনের কাছে চলে যাই। আমি ভারতে থাকতে চাইনি। আমি চাইনি আমার ভাবীদের মত বিয়ে করে বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সংসার করতে। আমি চেয়েছিলাম চাকরি করব, অর্থ উপার্জন করব। নিজের মত জীবন যাপন করব,” বলেন কিরনজিৎ।

কিন্তু ইংল্যাণ্ডে বসবাসকারী তার আর এক বোন যখন বিয়ের জন্য সম্বন্ধ আনলেন তখন তাকে সেটা মেনে নিতে হল।

”সে আমাকে দেখতে ক্যানাডা এসেছিল। আমরা মিনিট পাঁচেকের মত কথা বলেছিলাম। আমি সম্মতি দিয়েছিলাম- বলেছিলাম হ্যাঁ। আমি জানতাম আমার হাতে আর কোন পথ ছিল না। বিয়ে আমাকে করতেই হতো। সেটাই হল। আমার স্বাধীনতার সেখানেই ইতি।”

তার স্বামীকে দেখে প্রথমে তার কী মনে হয়েছিল সেকথা বলছিলেন কিরনজিৎ। ”খুব সুপুরুষ, আকর্ষণীয় এবং দারুণ মিষ্টি স্বভাব।” কিন্তু কখন যে তার মেজাজ মর্জি বদলে যাবে তা কখনও তিনি বুঝতে পারেন নি। একটা মুহূর্তে সোনার মত ভাল ব্যবহার, কিন্তু পরমুহূর্তেই রুক্ষ্ম ও বদরাগী, বলছিলেন তিনি।
সোনার আংটি

বিয়ের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় অত্যাচার।

”তার রাগ হলে কথা নেই,” বলছিলেন কিরনজিৎ। ”চিৎকার, অত্যাচার, জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলা, আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া, ছুরি নিয়ে ভয় দেখানো। কতবার যে সে আমার গলা টিপে ধরেছে। এসব যখন হতো আমার শরীরে দাগ হয়ে যেত। দিন কয়েকের জন্য কথা বলার ক্ষমতা থাকত না আমার।”

”আমার মনে আছে- সেদিন ছিল ওর জন্মদিন। আমি ওভারটাইম করে ওর জন্য একটা সোনার আংটি কিনেছিলাম জন্মদিনের উপহার হিসাবে। সেই সপ্তাহেই একদিন ওর মেজাজ চড়ে গেল। ওই আংটি দিয়ে ও আমার দাঁত ভেঙে দিল। আমার মুখে ঘুঁষি মারল।”

কিরনজিৎ বলছিলেন প্রত্যেকবার তিনি যখন পালানোর চেষ্টা করেছেন, তার স্বামী তাকে খুঁজে বের করেছে, ঘরে ফিরিয়ে এনেছে। তারপর প্রহার করেছে।

বিয়ের পাঁচ বছর পর তারা দুজনে ভারত বেড়াতে গিয়েছিলেন। তখন কিরনজিৎ তার বড় ভাইকে বলেছিলেন স্বামী তার ওপর কীধরনের অত্যাচার নির্যাতন করেন। তার পরিবারের সদস্যরা প্রথমদিকে কষ্ট পেয়েছিলেন সব শুনে, কিন্তু এরপর তার স্বামী ক্ষমা চাওয়ার পর তারা তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বাসায় ফেরত পাঠান।

এর মাস কয়েক পর, ইংল্যাণ্ডে ফেরত আসার পর, অত্যাচার নির্যাতন আবার শুরু হয়।

দীপক অন্য এক নারীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে জড়িয়ে পড়েন এবং স্ত্রীর কাছে অর্থ চান। আগুন লাগানোর ঘটনার আগে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্কাতর্কি হয়।

”আমি পালাতে পারিনি, ডিভোর্স পাইনি। পরিবারের দিক থেকে বাচ্চা নেবার জন্য চাপ ছিল। সবাই বলছিল বাচ্চা করো, দেখবে সে বদলে গেছে। তার মধ্যে একটা দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে।”

”কিন্তু সে কখনই বদলায়নি। দিনকে দিন অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে।”

স্বামীকে খুনের দায়ে কিরনজিৎ যখন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ান, তিনি বলেন তিনি যে অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তা আমলে নেয়া হয়নি, এবং বিচারের রায় শুনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

কৌঁসুলি বলেছিলেন তার স্বামীর পরকীয়া প্রেমের কারণে তিনি ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে স্বামীকে খুন করেছিলেন। তাদের আরও যুক্তি ছিল তাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ওই পরকীয়া প্রেম নিয়ে যে বাদানুবাদ হয়েছিল, এবং তার ‘প্রতিশোধ’ নেয়ার মধ্যে যথেষ্ট সময় ছিল। এর মধ্যে তার মাথা ঠাণ্ডা করার যথেষ্ট সুযোগ ছিল এবং সে কী করতে যাচ্ছে তা নিয়ে ভাবার যথেষ্ট অবকাশ ছিল।

”ব্রিটিশ আইনের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা ছিল। আমার ধারণা ছিল ব্রিটিশ আইন আধুনিক এবং এই আইন আমার সমস্যাটা আমলে নেবে। আমি যে কিসের মধ্যে দিয়ে গেছি তা বুঝবে। তারা কিন্তু আমি কত বছর অত্যাচার ও দুবির্ষহ নির্যাতনের জীবন কাটিয়েছি তা কখনও আমলে নেয়নি।”

কিরনজিৎ বলেন, কারাগারে যাবার পর তার মনে হয়েছিল তিনি মুক্ত- স্বামীর থেকে অনেক দূরে।

তিনি সেখানে ব্যাডমিন্টন খেলতেন, ইংরেজি ভাষার ক্লাস নিতেন। জেলখানায় বসেই তিনি আরেকজনের সঙ্গে মিলে লিখেছিলেন তার জীবন কথা, যা নিয়ে পরে তৈরি হয় ছায়াছবি।

কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় নারীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করে এমন একটি সংগঠন সাউথহল ব্ল্যাক সিস্টারর্স তার মামলার সঙ্গে জড়িত হয়।

”আমরা সেসময় তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম এবং তার পারিবারিক সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম। আমরা আইনজীবীদের বোঝাতে চেয়েছিলাম কেন কিরনজিতের মত পরিবারের একজন মেয়ের পক্ষে অত্যাচার নির্যাতনের ওই বিয়ে ভেঙে বেরিয়ে আসা সহজ ছিল না,” বলছিলেন সংস্থাটির পরিচালক প্রজ্ঞা প্যাটেল।

কিন্তু তিনি বলেন আদালত এসব যুক্তিতে ”কর্ণপাত করেনি” এবং তার আইনজীবীরাও তার পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতির সমস্যাটা ”জানতে চায়নি”।

এই সংগঠনের অব্যাহত প্রচেষ্টা ও আইনী সহায়তার কারণে ১৯৯২ সালে কিরনজিতের আপিল গ্রহণ করা হয়।

বহু বছর ধরে সহিংসতা আর অত্যাচারের কারণে তার যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক অবসাদ তৈরি হয়েছিল সে সম্পর্কে আদালতের সামনে নতুন তথ্য পেশ করা হয়।

আদালত এই যুক্তি মেনে নেন যে তর্কাতর্কি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার মধ্যে যে সময়টা ছিল তাতে কিরনজিতের মানসিক অবস্থায় ”মাথা ঠাণ্ডা” করার বদলে ”মাথা গরম” করাটাই স্বাভাবিক ছিল।

আদালতে এই মামলা আবার ওঠে পুর্নবিচারের জন্য এবং তার ”অনিচ্ছাকৃত হত্যা”-র আবেদন আদালত গ্রহণ করে। তার আগের দণ্ডাদেশ খারিজ করে দিয়ে নতুন করে তাকে তিন বছর চার মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। সেসময় কিরনজিৎ ঠিক তিন বছর চার মাস খেটে ফেলেছে।

ফলে তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হয়।

তার মুক্তি ছিল একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। কারণ আদালত মেনে নিয়েছিল যারা পারিবারিক নির্যাতনের শিকার তাদের অবস্থাকে উস্কে দিলে সে আগুন নেভার বদলে ”ধীরে-ধীরে আরও প্রজ্জ্বলিত” হতে পারে।

ওই রায় আরও একটা বার্তা দিয়েছিল যে যে নারী চরম পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়ে খুনের পথ বেছে নেয়, তাকে ঠাণ্ডা-মাথায় খুনের আসামী হিসাবে গণ্য করাটা সঠিক নয়।

‘একটা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’

কিরনজিতের আপিল ওই সাউথহল ব্ল্যাক সিস্টার্স সংগঠনের ৪০ বছরের ইতিহাসে সংস্থার জন্য ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মামলা।

এই মামলায় সংগঠনের বিজয় এবং কিরনজিতের মুক্তির বার্ষিকী উপলক্ষে তাকে নিয়ে তৈরি ছবি ”প্রোভোকড্” প্রদর্শিত হয়েছে গেল সপ্তাহান্তে।

প্রজ্ঞা বলছেন ব্রিটেনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতন ও অত্যাচারের ঘটনা কমেনি, বরং বেড়েছে। হয়ত বা মেয়েরা এধরনের ঘটনা আগের তুলনায় বেশি সামনে আনতে সাহস পাচ্ছেন – সেটাও একটা কারণ হতে পারে।

কিরনজিৎ বাস করেন ইংল্যাণ্ডে। তিন দশক পরে নিজের জীবন তিনি আবার গড়ে তুলেছেন।

“আমি খুব খাটি, চাকরি করি। আমার দুই ছেলে স্নাতক পাশ করেছে। আমি এখন দাদীও।”

”ওই তিরিশটা বছর ছিল আমার জীবনের একটা দু:স্বপ্ন।” -বিবিসি বাংলা।