Search
Saturday 19 October 2019
  • :
  • :

এবার আরও বড় বন্যার ভয়

এবার আরও বড় বন্যার ভয়

ঢাকা, ১২ মে : বর্ষা মৌসুমের আগে বৈশাখজুড়েই সারাদেশে ভারী ও অতিভারী বর্ষণ হচ্ছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, চলতি সপ্তাহেই দেশের বিভিন্ন জেলায় অতিভারী বর্ষণের আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া গতবারের তুলনায় এবার আরও বেশি জেলা বন্যায় প্লাবিত হবে। প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বছর ৩৭টি জেলায় বন্যা হতে পারে আসছে বর্ষা মৌসুমে। গতবার দেশের বিশাল হাওরাঞ্চলসহ বন্যাক্রান্ত হয়েছিল ২২টি জেলা। উপরন্তু চলতি মে মাসের মাঝামাঝি আগাম বন্যারও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এদিকে এ বছর বজ্রপাতে এ পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। কালবৈশাখী ও শিলাবৃষ্টিতে বিভিন্ন জেলার বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতোমধ্যেই।

উজান ভাগ উত্তর-পূর্ব ভারতে এখনই টানা ভারী বৃষ্টিপাতে এরই মধ্যে ১৩ রাজ্যে সতর্কতা জারি হয়েছে। তাই ভাটিতে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় নদনদীর পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ছাড়া দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলেও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ওই অঞ্চল ছাড়াও বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির পানির ঢলে আকস্মিকভাবে স্বল্প থেকে মধ্যমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মধ্য জুনের পর থেকে শুরু করে জুলাই ও আগস্ট মাস পর্যন্ত বন্যাকে এ দেশে মৌসুমি বা স্বাভাবিক বন্যা বিবেচনা করা হয়। তবে প্রাক-বর্ষায় অর্থাৎ এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যভাগ পর্যন্ত সংঘটিত বন্যাকে আগাম বা অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক বন্যা ধরা হয়।

গত বছর আগাম বন্যার কবলে পড়েছিল দেশ বিবেচিত সময়েরও আগে, ফেব্রুয়ারিতে। সে সময় পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ধসে ১৬৯ জন মারা যান। এ বছরও অতিবর্ষণ ও ভারী বর্ষণে আগাম বন্যা, পাহাড় ও ভূমিধসের ভয় রয়েছে। এমন বিপর্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখে করণীয় নির্ধারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলায় ইতোমধ্যে জরুরি সভা হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এ প্রতিবেদককে জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সম্ভাব্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে অতিবর্ষণে তিন জেলা অর্থাৎ ময়মনসিংহ নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জসহ হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার আশঙ্কা করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বন্যার আশঙ্কা বেশি দেখা দেওয়ায় সেসব অঞ্চলের ফসল কেটে ঘরে তোলার পরার্মশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ব্যাপক প্রচারে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই হাওর অঞ্চলের ৮৮ শতাংশ মাঠের ফসল কেটে নেওয়া হয়েছে। জেলাগুলোয় বাম্পার ফলন হয়েছে বলে দাবি তাদের।

জানা গেছে, গত বছর আগাম বন্যায় ২২ জেলার ৭ হাজার ১৩০ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় জামালপুর জেলা। দুর্গত অঞ্চলগুলোয় মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ধানের আবাদ। দেশের শস্যভা-ারখ্যাত উত্তরবঙ্গে বোরোর উৎপাদন মার খায় ভীষণ। এর জেরে নানা চেষ্টা চালিয়েও সরকার বোরো কিনতে ব্যর্থ হয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে চালের বাজারে। কারণ তখন থেকেই চালের বাজার চড়া হয়, যার রেশ টানতে হচ্ছে চলতি বছরের ভরা মৌসুমেও। গতবারের বন্যায় প্রধান খাদ্যশস্য ধানই শুধু নয়, আক্রান্ত জনপদগুলোর সহায়-সম্পদও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৬১ হাজার ১০৮টি টিউবওয়েল, ৫০টি ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ৩৭৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ, ৪৪৬টি ব্রিজ ও কালভার্ট ভেসে যায় বন্যার তোড়ে।

খ্যাতনামা গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানায়, হাওরে আগাম বন্যা ও মৌসুমি বন্যায় মোট ১৫ সহস্রাধিক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতবারের মতো এবারও অতিবর্ষণে বন্যা, পাহাড় ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে বোরো উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে চিন্তিত খাদ্য বিভাগের কর্তারা।

খাদ্য অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক আব্দুল আজিজ মোল্লা এ প্রসঙ্গে এ প্রতিবেদককে জানান, আগাম বন্যা বা দুর্যোগের কথা মাথায় রেখে অভ্যন্তরীণ সংগ্রহে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে চিন্তা থাকলেও খাদ্য মজুদ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই বলে মনে করেন তারা।

এদিকে আগাম ও মৌসুমি বন্যা মোকাবিলার প্রাক-প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। বৈঠকে সেনা ও নৌবাহিনীর কর্মকর্তারাও ছিলেন। ওই দুই বাহিনীকেও বন্যাসহ যে কোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় দেশবাসীর জন্য এগিয়ে আসতে প্রস্তুত থাকার কথা বলা হয়েছে। দেশের সব জেলা প্রশাসকের কাছে বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঠানো হয়েছে প্রয়োজনীয় বার্তা।

এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে, চলতি মে মাসে বঙ্গোপসাগরে দুটি নিম্নচাপের আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে পারে। এ মাসেই দেশের উত্তর থেকে মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত দুই থেকে তিন দিন মাঝারি থেকে প্রবল আকারে বজ্রপাত, বজ্র ও কালবৈশাখী বয়ে যেতে পারে। মে মাসে দেশের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ সময় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সময় দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। যদিও গত মাসে (চৈত্র-বৈশাখ) সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।

ধানকাটা ও মাড়াই নিয়ে দুশ্চিন্তা

৪ মে থেকে ১১ মে পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণকেন্দ্রকে একই আভাস দেওয়া হয়েছে। এ কারণে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব জমির বোরো ধান কাটতে সুনামগঞ্জের সর্বত্র মাইকিং করে কৃষকদের সতর্ক করা হয়েছে। এমন ঘোষণায় কৃষকদের কাটা ধান স্তূপীকৃত হয়ে আছে। রোদের অভাবে সেসব ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন কৃষক। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, এতে ফসলের কোনো ক্ষতি হবে না।

জানা গেছে, দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলসহ সুনামগঞ্জের হাওরে এখনো জমিতে পড়ে আছে আধাপাকা ধান। পানি বিলম্বে নামায় এবার হাওরে ধান পেকেছে বিলম্বে। এখন বজ্রপাতের আতঙ্কসহ নানা কারণে হাওরে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধি পাওয়ার মওকায় স্থানীয় দুষ্কৃতকারীরা হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ কেটে দিতে পারে, এই আশঙ্কায় তিন উপজেলার বাঁধ তদারকবিষয়ক কমিটি থানায় জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছে। সূত্র: আমাদের সময়