Search
Tuesday 24 May 2022
  • :
  • :

একাধিক পদে বিএনপি নেতারা

একাধিক পদে বিএনপি নেতারা

ঢাকা, ১৬ অক্টোবর : বিএনপিতে বহু নেতা একাধিক পদ দখল করে আছেন। নেতাদের মধ্যে কেউ পাঁচটি, কেউ চারটি, কেউ তিনটি; আবার কেউ দুটি পদ দখল করে রেখেছেন। যাঁরা কেন্দ্রে বড় পদে আছেন, তাঁরা আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নিজ নিজ জেলা বা উপজেলার বড় পদটিও দখল করে রেখেছেন। আবার এক পরিবারে স্বামী-স্ত্রীর চারটি পদ রাখার নজিরও রয়েছে। একাধিক পদ দখলকারী অনেক নেতা জেলার রাজনীতিতে যেমন নিষ্ক্রিয়, কেন্দ্রের রাজনীতিতেও তেমন নিষ্ক্রিয়। পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, একাধিক পদ দখলকারীরা ঠিকমত একটি পদেই দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অথচ তাঁরা একাধিক পদ দখল করে রেখেছেন বছরের পর বছর ধরে। ফলে সেই জেলার যোগ্য একজন পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক যোগ্য নেতাকর্মী রাজপথে থেকে হামলা-মামলার শিকার হলেও দলে পদ পাচ্ছেন না।

দলের নেতাকর্মীরা জানান, স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন মাঠ পর্যায়ের অনেক ত্যাগী আর পরীক্ষিত নেতাকর্মী। অনেক মেধাবী ছাত্রদল নেতা দলীয় ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। পদ সঙ্কটের অজুহাতে তাঁদের দল পদপদবি দেওয়া  যাচ্ছে না।

বিএনপি সূত্র জানায়, ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত গঠনতন্ত্রে এক নেতার একাধিক পদে থাকার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বিধিবিধানও নেই। গঠনতন্ত্রের ১১(ঙ) অনুচ্ছেদ জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে একই ব্যক্তি দলের একাধিক স্তরে সভাপতি কিংবা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। দলের পক্ষ থেকে বার বার মৌখিক নির্দেশ পাওয়া সত্ত্বেও তা তোয়াক্কা না করে পদ আঁকড়ে রেখেছেন তাঁরা। এ ব্যাপারে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার কার্যালয়ে অনেক অভিযোগও জমা পড়েছে। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে দলের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমাজউদ্দীন আহমদ এ ব্যাপারে এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কেন্দ্র এবং জেলায় একজনের একাধিক পদে দায়িত্ব পালন করা কঠিন। এতে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন নেতারা। এ বিষয়গুলো আমি খেয়াল করব। আলোচনা করে দেখব। দলীয় স্বার্থে বেশিরভাগ লোককেই ‘ইনভল্ব’ করা ভালো। একজনের একাধিক পদে না থেকে একটি পদে একজন থাকলে অন্যদের জন্যও দরজা খোলা থাকে। তাঁরাও সুযোগ পান। দলের জন্যও ভালো হয়।’

জানা যায়, দল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে সম্প্রতি নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলা বিএনপি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সভাপতি হয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় জাতীয় নির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক জয়নুল আবেদীন ফারুক। কেন্দ্র এবং উপজেলা মিলে তাঁর দুটি পদ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নোয়াখালী জেলার এক নেতা বলেন, ‘এ ধরনের নেতারা গাছেরটাও খাবেন, আবার মাটিরটাও কুড়াবেন। এঁরাই দলের নেতা, এঁরাই দলের কর্মী। তাঁদের বাইরে আর কেউ বোধ হয় বিএনপি করেন না। কেন্দ্র থেকে উপজেলা পর্যন্ত সব পদ তাঁদের দরকার।’

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আবুল খায়ের ভূঁইয়া দখল করে আছেন লক্ষ্মীপুর জেলা সভাপতির পদ। একইসঙ্গে তিনি ঢাকা মহানগরেরও নেতা। জেলা বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তিনি ঢাকার রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত। বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মজিবর রহমান সরোয়ারও একাধিক পদ দখল করে আছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, শ্রমিক দলের উপদেষ্টা; অন্যদিকে বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন।

একটি সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একাই এখন ৫টি পদের অধিকারী। গঠনতন্ত্র ও কেন্দ্রীয় কমিটির তালিকানুযায়ী ২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর তিনি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে থাকার কারণে তিনি পদাধিকারবলে স্থায়ী কমিটিরও সদস্য। তবে দলের গঠনতন্ত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নামে কোনো পদ না থাকায় এক্ষেত্রে একটি ধূম্রজাল রয়েছে নেতাকর্মীদের মাঝে। বিএনপির এই গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার পরও প্রায় এক যুগ ধরে তিনি কৃষক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির পদ ও তাঁর নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির পদ ছাড়ছেন না।

বিএনপির শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন ও তাঁর স্ত্রী শিরিন সুলতানা ধরে রেখেছেন চারটি পদ। কেন্দ্রীয় শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ছাড়াও তিনি নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি। তাঁর স্ত্রী শিরিন সুলতানা কেন্দ্রীয় মহিলা বিষয়কসহ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক। কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, খোকন নরসিংদীর রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। আবার জেলার নেতাকর্মীরা জানান, আমাদের নেতা কেন্দ্রীয় রাজনীতি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। একই অভিযোগ শিরীন সুলতানার ক্ষেত্রেও। তিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের সঙ্গে থাকেন বলে কেন্দ্রীয় রাজনীতি নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। এমনটাই বিশ্বাস নেতাকর্মীদের।

দুই পদ দখল করে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তিনি একইসঙ্গে স্থায়ী কমিটির সদস্য আবার ঢাকা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য শামসুজ্জামান দুদু একইসঙ্গে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক ও চুয়াডাঙ্গা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব আমানউল্লাহ আমানও একইসঙ্গে ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। ঢাকা জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি আবদুল মান্নান একইসঙ্গে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমেদ আজম খান একইসঙ্গে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য।

বিএনপির দফতর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ একইসঙ্গে দলের যুগ্ম মহাসচিবের পদেও আছেন। অপর যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান নোয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি। যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। অন্য যুগ্ম মহাসচিব সালাউদ্দিন আহমেদ কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি।
রাজশাহী জেলা বিএনপির সভাপতি নাদিম মোস্তফা কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ সম্পাদক পদে রয়েছেন। কেন্দ্রীয় কমিটির ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি। দলের ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী একইসঙ্গে পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সভাপতি। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর বীর উত্তম ঝালকাঠি জেলা বিএনপির সভাপতি।

রাবেয়া চৌধুরী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান, একইসঙ্গে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক কবির মুরাদ মাগুরা জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। একইসঙ্গে তিনি জিয়া পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি। সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী কেন্দ্রীয় বিএনপির ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক। তিনি একইসঙ্গে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সভাপতি। ফরিদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাদা মিয়া কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-শিল্পবিষয়ক সম্পাদক। গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক। অন্যদিকে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি। কেন্দ্রীয় সহ-সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক এমএ মালেক বিএনপির অঙ্গসংগঠন জাসাস সভাপতি।

দলের কেন্দ্রীয় কমিটির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু একইসঙ্গে কমিটির গ্রাম সরকারবিষয়ক সম্পাদক। এছাড়া তিনি লালমনিরহাট জেলা বিএনপিরও সভাপতি। রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক ও নাটোর জেলা বিএনপির সভাপতি। দলের যুববিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুবদলের সভাপতির পাশাপাশি ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য। স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল কেন্দ্রীয় কমিটির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদকের পাশাপাশি নবগঠিত ঢাকা মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছেন। দলের সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি। সহ-মহিলাবিষয়ক সম্পাদক নুরে আরা সাফা মহিলা দলের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এ নেতাদের পাশাপাশি আরও অনেক নেতা একাধিক পদ দখল করে আছেন। দলে প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকাতেও নেতাকর্মীদের ওপর সমান ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন তাঁরা। তাঁরা বেশিরভাগই রাজধানীতে থাকেন। আর ঢাকাতে বসেই এলাকার নেতৃত্ব দেন। এসব কারণেই এলাকার অনেকে তাঁদের নির্দেশনা মানছেন না; এতে করে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি অনেক দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

দলীয় সূত্র জানায়, নিয়মমাফিক দলের কাউন্সিল না হওয়া এবং সঠিক মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বছরের পর বছর ধরে এসব নেতা একাধিক পদ দখল করে আছেন। একাধিক পদে থাকলে দলে প্রভাব বিস্তারসহ বিভিন্ন ধরনের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পান তাঁরা। আর এ কারণেই কেউ পদ ছাড়তে নারাজ। যার কারণে ক্ষুব্ধ পদবঞ্চিতরা। দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ‘এক নেতার একটা পদ’নীতি মেনে অবিলম্বে একাধিক পদপ্রাপ্ত সব নেতার একটি পদ রেখে অন্যান্য পদ থেকে অব্যাহতি প্রদানের দাবি করে আসছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। -ভোরের পাতা




Leave a Reply

Your email address will not be published.