Search
Wednesday 13 December 2017
  • :
  • :

আস্থা বাড়ছে পুঁজিবাজারে

আস্থা বাড়ছে পুঁজিবাজারে

পুঁজিবাজার ডেস্ক : ২০১০-এর পর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ যতটা আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ২০১৭ সালে এসে ততটাই সুরক্ষিত হয়েছে। এমন মন্তব্য বাজার সংশ্লিষ্টদের। এ সময়ে বেড়েছে বিদেশি বিনিয়োগ, বেড়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এবং মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে সহজ করা হয়েছে লেনদেন।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী বলেন, বিও হিসাব কমেছে মানে যে বিনিয়োগকারীরা বাজার ছাড়ছে এটি সঠিক নয়। মূলত বিও হিসাব নবায়ন করা না হলে এ সময়টিতে আগের তুলনায় বিও হিসাব কমে আসে। বাজার এখন যেভাবে যাচ্ছে তাতে দীর্ঘমেয়াদে যারা বিনিয়োগে আগ্রহী তারা দেখে বুঝে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন। বর্তমান বাজারে টানা ঊর্ধ্বমুখী থাকার পর ক্রমাগত পতনের যে রেশ আগে ছিল সেটি কেটে গেছে। পুঁজিবাজারের উত্থান-পতন নির্ভর করে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর। পুঁজিবাজারের সুরক্ষায় অনেক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর সুফল বিনিয়োগকারীরা এখন পাচ্ছেন।

বিএলআই ক্যাপিটাল লিমিটেডের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বাজার বিশ্লেষক দেবব্রত কুমার সরকার বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি মানে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিবাজারের জন্য সুসংবাদ থাকছে। এ সময়টিতে বিও হিসাব কমে গেছে বলে আতঙ্কের কিছু নেই। ২০১০ সালের পুঁজিবাজার এবং ২০১৭ সালের পুঁজিবাজারের মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। আইন-কানুন এখন বাজারে বিনিয়োগ উপযোগী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বিএসইসির যে ব্যবধান ছিল এখন সেটি অনেকটাই সমাধান হয়েছে। তিনি বলেন, মোবাইল অ্যাপসের মাধ্যমে বিনিয়োগ এখন অনেক সহজ করা হয়েছে। ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কোম্পানি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ফলে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীরা আস্থা রাখতে পারেন।

বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী সম্মিলিত জাতীয় ঐক্যের সাধারণ সম্পাদক আ ন ম আতাউল্লাহ নাঈম বলেন, পুঁজিবাজারের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ২০১০-এর পর থেকে ২০১১ এবং ২০১২ সালের পুঁজিবাজারের দিকে তাকালে দেখা যেত যখন বাজারে পতন শুরু হতো তখন শুধু সূচক কমতেই থাকত। আবার যখন বাড়তে থাকত তখন শুধুই বাড়ত। ফলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উত্থান আর পতন নিয়ে এক ধরনের আস্থাহীনতা থাকত। এখন সেটি নেই। আশা করা যায় ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কোম্পানি যখন বাজারে কাজ করবে তখন পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আরও সুরক্ষিত হবে।

ডিএসই অ্যাপ : লেনদেনে প্রযুক্তি উন্নয়ন করেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি এক বছর আগে মোবাইলের মাধ্যমে লেনদেন চালুর ব্যবস্থা করে। চালু করে মোবাইল অ্যাপস। এক বছরে মোবাইলে লেনদেনকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাতগুণ।

বিনিয়োগকারীদের লেনদেন পদ্ধতি সহজ করার উদ্দেশ্যে ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ডিএসইতে সংযোজন হয় মোবাইল অ্যাপ। একই বছরের জুনে ব্যবহারকারী ২ হাজার অতিক্রম করে। অক্টোবরে তা দ্বিগুণ হয়। ডিসেম্বরে মোবাইলে লেনদেনে গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬ হাজার। ২০১৭ সালের শুরুর দিকে এটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ২০১৭-এর প্রথম চার মাসে গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ১৩ জুলাই পর্যন্ত মোবাইলে লেনদেন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৫ হাজার ২৮৭ জন। সেখানে ১১ জুলাই পর্যন্ত মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন করে এমন রেজিস্টার্ড গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ১৫ হাজার ১৫৪ জন। আর এ সময়ে ডিএসইর মোবাইল অ্যাপসের মোট ১৯ হাজার ১২৪টি লেনদেনের আদেশ দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৩ হাজার ২৯৯টি লেনদেন সম্পন্ন হয়।

এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের ব্রোকার হাউসের মাধ্যমে স্মার্ট ফোনে অ্যাপস ডাউনলোড করে পুঁজিবাজারের যে কোনো আর্থিক তথ্য দ্রুত সংগ্রহ করতে পারছেন। তাছাড়া ম্যানেজমেন্ট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা পোর্টফোলিও সম্পাদন এবং যে কোনো স্থান থেকে লেনদেনে অংশগ্রহণ করে তা সম্পন্ন করতে পারছেন।

ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কোম্পানি : চালু করা হচ্ছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট) বিধিমালার আলোকে নতুন ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কোম্পানি। এজন্য গঠন করা হয়েছে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট ‘সেন্ট্রাল কাউন্টার পার্টি (সিসিপি) ফরমেশন কমিটি’।

এ কমিটির প্রধান করা হয় ডিএসইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবুল হাশেমকে। এছাড়া কমিটিতে ডিএসইর দুইজন প্রতিনিধি, সিএসই ও সিডিবিএল থেকে একজন করে প্রতিনিধি এবং ব্যাংকগুলো থেকে একজন প্রতিনিধি রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান। ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কোম্পানি মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড লেনদেনের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে নতুন পণ্য যেমন ডেরিভেটিভস, কমোডিটি এক্সচেঞ্জ চালুসহ একদিনেই লেনদেন নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ : ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ হাজার ২৬৬ কোটি, যা মে মাসের তুলনায় ৯১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা বেশি। বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মূলত লভ্যাংশ হিসেবে বোনাস শেয়ার ইস্যুর কারণে এ মূলধন বেড়েছে। এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশ ছিল ৪৬ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। মে শেষে ছিল ৪৪ হাজার ৫১১ কোটি টাকা।

বিদেশি বিনিয়োগ : ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি নিট বিনিয়োগ বেড়েছে। গেল অর্থবছরের তুলনায় এ নিট বিনিয়োগ বেড়েছে ২৮৫ দশমিক ৪২ শতাংশ বা ১ হাজার ৩৯০ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে মোট বিদেশি নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৭৮ কোটি ১৫ লাখ ৩৮ হাজার ২৪৫ টাকা। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৮৭ কোটি ৩০ লাখ ৬২ হাজার ৬৪১ টাকা।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বিদেশি পোর্টফোলিওতে মোট লেনদেন হয়েছে ৮ হাজার ৯৩৬ কোটি ৭৪ লাখ ৪ হাজার টাকা। এর মধ্যে পোর্টফোলিওতে শেয়ার ক্রয় করা হয়েছে ৫ হাজার ৪০৭ কোটি ৪৪ লাখ ৭১ হাজার ১৫৪ টাকা। আর এর বিপরীতে পোর্টফোলিওতে শেয়ার বিক্রয় করা হয়েছে ৩ হাজার ৫২৯ কোটি ২৯ লাখ ৩২ হাজার ৯০৯ টাকা। এ সময়ে শেয়ার বিক্রির চেয়ে কেনার হার বেড়েছে ৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ বা ১ হাজার ৮৭৮ কোটি ১৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। গেল অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি নিট বিনিয়োগ এসেছে ডিসেম্বর ও মার্চ মাসে। এই ২ মাসে মোট নিট বিনিয়োগ ছিল ৭০০ কোটি টাকার ওপরে। তবে সবচেয়ে নিট বিনিয়োগ কমেছিল আগস্ট মাসে। আলোচ্য মাসে বিদেশি নিট বিনিয়োগ নেতিবাচক ছিল ৩ কোটি ৭৫ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

২৭ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজিবাজারে : ২০১৭ সালের শুরুতে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর যে সংখ্যা ছিল জুনের পর তা প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ বিও হিসাব কমেছে। ১৭ জুলাই পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিও হিসাব রয়েছে ২৭ লাখ ৩৯ হাজার ৫৩৬টি। এর মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারীর বিও রয়েছে ১৯ লাখ ৯৮ হাজার ৫০টি এবং মহিলা বিনিয়োগকারীর বিও রয়েছে ৭ লাখ ৩০ হাজার ২০৮টি।

এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বর্তমানে ১১ হাজার ২৭৮ জন। উল্লেখিত সংখ্যক বিনিয়োগকারীর মধ্যে একক নামে বিও হিসাবধারীর সংখ্যা বর্তমানে ১৭ লাখ ২৮ হাজার ৪৮৩টি এবং যৌথ মালিকানায় বিও হিসাব রয়েছে ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৭৭৫টি এবং কোম্পানির নামে নিবন্ধিত বিও রয়েছে ১১ হাজার ২৪৮টি।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি অব বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) তথ্যানুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পুঁজিবাজারে বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫১। এর মধ্যে পুরুষ বিনিয়োগকারী ছিল ২১ লাখ ৪৭ হাজার ২৩, নারী বিনিয়োগকারী ৭ লাখ ৯৬ হাজার ৫১১ ও কোম্পানির বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ২১৭টি। আর ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর মোট বিও হিসাবের সংখ্যা ছিল ২৯ লাখ ৪১ হাজার ৮৬৮।

সে হিসাবে দেড় মাসের ব্যবধানে পুঁজিবাজারে নতুন বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছিল ১২ হাজার ৮৮৩ জন। বর্তমানে চালু থাকা বিও হিসাবগুলোর মধ্যে একক বিওর সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৯ ও যৌথ হিসাব ১০ লাখ ৯৭ হাজার ৮৯৫টি। এছাড়া মোট বিওর মধ্যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের নামে রয়েছে ২৭ লাখ ৯৩ হাজার ৭৯টি ও অনিবাসী বাংলাদেশীদের নামে রয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ৪৫৫টি বিও হিসাব।