Search
Sunday 22 May 2022
  • :
  • :

অ্যালিগেটরের গুপ্তধন

অ্যালিগেটরের গুপ্তধন

কিশোর মুসা রবিন

রকিব হাসান

এক

তিন গোয়েন্দার স্কুল ছুটি। হাতে কোনো কাজ নেই। তাই বেরিয়ে পড়ল ওরা দিগ্বিজয়ে, অর্থাৎ ফ্লোরিডার এভারগ্লেড দেখতে। সেই সঙ্গে দেখবে সোয়াম্পল্যান্ডের অতি জনপ্রিয় খেলা রোডেও।

জলাভূমির যে জায়গাটাতে এসেছে ওরা, সেটার নাম গেটর সোয়াম্প। রবিনের এক কাজিন রাস্টি কালাহানের সঙ্গে এসেছে ওরা। রাস্টি পেশাদার পাইলট। রোডেও খেলার ভক্ত। সময় পেলেই রোডেও দেখতে চলে আসে রাস্টি। মাঝে মাঝে নিজেও খেলায় অংশ নেয়। রোডেওর ব্যাপারে আগ্রহ দেখিয়েছিল রবিন। রাস্টি ওকে বলে রেখেছিল, পরেরবার যখন রোডেও দেখতে যাবে, তিন গোয়েন্দাকেও সঙ্গে নেবে। কথা রেখেছে রাস্টি। নিয়ে এসেছে এবার। এভারগ্লেডের যে জায়গাটাতে এনেছে, তার নাম ‘গেটর সোয়াম্প’।

দক্ষিণ ফ্লোরিডার বিস্তীর্ণ জলাভূমিকে বলে এভারগ্লেড। পানিতে জন্মে থাকে লম্বা লম্বা ঘাস। সো-গ্রাস বা করাত-ঘাস বলে এগুলোকে। পানির নিচের কাদামাটিতে জন্মায়, বাড়তে বাড়তে মাথা তুলে দেয় পানির ওপর। ঘাসের জঙ্গলই বলা চলে এগুলোকে। জলার মাঝে মাঝে শুকনো ডাঙা যেন দ্বীপের মতো পিঠ উঁচিয়ে রেখেছে। এই দ্বীপগুলোর স্থানীয় নাম ‘কী’। দক্ষিণ ফ্লোরিডার এই এভারগ্লেডে এ রকম হাজার হাজার দ্বীপ ছড়িয়ে আছে।

নানা ধরনের উদ্ভিদ জন্মায় এসব দ্বীপে। সবচেয়ে বেশি ম্যানগ্রোভ গাছের জঙ্গল, পানির কিনার ঘেঁষে থাকে।

সাধারণ চাকাওয়ালা প্লেন এভারগ্লেডে নামতে পারে না। তাই হাইড্রোপ্লেন নিয়ে এসেছে রাস্টি।

হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল মুসা, ‘আরে, গাছে লাগল তো! দেখে চালান, রাস্টি ভাই।’

জটলা করে থাকা ম্যানগ্রোভ গাছের প্রায় পাতা ছুঁয়ে উড়ে গেল হাইড্রোপ্লেন।

ছোট্ট বিমানের নাকটা টেনে তুলল পাইলট রাস্টি কালাহান। মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘ভয় পেলে?’

‘নাহ্!’ গলা কাঁপছে মুসার। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ভুরুর ঘাম মুছে বলল, ‘তবে বিমান দুর্ঘটনায় মারা যাচ্ছি ভেবে পিলে চমকে গিয়েছিল!’

পেছনের সিটে কিশোরের সঙ্গে ঠাসাঠাসি করে বসেছে রবিন। মুসার কথায় হেসে বলল, ‘তা ঠিক, পিলে চমকানোকে কি আর ভয় পাওয়া বলে? তবে ভিরমি খাওয়া বলা যেতে পারে। যা-ই হোক, একটা কথা মনে রেখো এখন থেকে, মুসা, রোডেও দেখতে এলে সব সময় রোডেও-মেজাজে থাকে কাজিন রাস্টি। কাজেই, সাবধান!’

কিশোর ভাবছে, বহুদূর পাড়ি দিয়ে এই বিচিত্র দেশটা দেখতে এসেছে ওরা। রকি বিচ থেকে ফ্লোরিডার মায়ামি, সেখান থেকে গেটর সোয়াম্প। এখানে ‘সোয়াম্পল্যান্ড গুডস’ নামে একটা জেনারেল স্টোরে নেমে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে নিয়ে চলে যাবে রাস্টির ফিশিং ক্যাম্পে। নিরালা ওই ক্যাম্পটাতেই থাকবে ছুটির কয়টা দিন।

একটা ‘কী’র কাছাকাছি এল প্লেন।

এক ঝাঁক সাদা পাখি উড়ে গেল। মায়ামি থেকে কিনে আনা ট্র্যাভেল বুকে ছাপা একটা পাখির ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে রবিন বলল, ‘ইগ্রেট!’

‘খিদে পেয়েছে কারও?’ পাখি নিয়ে মাথাব্যথা নেই মুসার। এক মুঠো চিপস মুখে পুরল। ‘বহুক্ষণের জন্যে এটাই হয়তো শেষ খাওয়া।’

‘বহুক্ষণ না, মাত্র কয়েক মিনিট,’ রাস্টি বলল। ‘সোয়াম্পল্যান্ড গুডসে পৌঁছে গেছি। খাবার কিনে নেব।’ করাত-ঘাসে ছাওয়া দিগন্ত বিস্তৃত জলাভ‚মির মাঝখানে বিশাল এক প্রাকৃতিক দিঘির দিকে এগিয়ে চলেছে প্লেন। নিচে নামছে ক্রমশ।

‘স্কি করে ল্যান্ড করাবেন?’ নিচে পানির দিকে তাকিয়ে আছে কিশোর।

‘হ্যাঁ,’ রাস্টি জবাব দিল। ‘চাকার বদলে রানার লাগানো থাকে হাইড্রোপ্লেনের তলায়। পন্টুনের মতোই কাজ করে এগুলো। এর সাহায্যে পানিতে ভেসে থাকে প্লেন।’

পানি ছুঁল রানার। তারপর হাঁসের মতো ভেসে সোয়াম্পল্যান্ড গুডসের দিকে এগিয়ে গেল প্লেন। কিনারে কাঠের জেটি। সেটাতে প্লেন ভেড়াল রাস্টি। ওর সঙ্গে ডাঙায় নামল তিন গোয়েন্দা।

পানির কিনারে মস্ত একটা কাঠের ছাউনি। এটাই সোয়াম্পল্যান্ড গুডস। জেনারেল স্টোর। গেটর সোয়াম্পের একমাত্র বাণিজ্যিক এলাকা। সমস্ত প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায় এখানে। নৌকা এমনকি ঘোড়াও ভাড়া পাওয়া যায়।

মাটিতে পা দিয়েই ডাফেল ব্যাগ থেকে একটা ল্যাসো টেনে বের করল মুসা-লম্বা দড়ির মাথায় ফাঁস পরানো-এর সাহায্যে গরু ধরে কাউবয়রা।

একটা ডক পোস্ট লক্ষ্য করে ল্যাসো ছুড়ল ও। ‘রকি বিচে পার্কিং মিটারগুলোর ওপর প্রচুর প্র্যাকটিস করেছি। একটাও মিস করিনি। গরু ধরার জন্যে আমি এখন রেডি।’

হাসল কিশোর। ‘মিটার আর গরু এক জিনিস নয়। একটা অচল, আরেকটা সচল। সচল প্রাণীর গায়ে ফাঁস পরানো অনেক কঠিন।’

জেনারেল স্টোরের বারান্দায় সবে পা রেখেছে ওরা, পার্কিং লটের দিক থেকে গর্জন শোনা গেল, ‘নড়লেই গলা ফাঁক করে দেব!’

ঝট করে ফিরে তাকাল কিশোর। একজন পুলিশ অফিসারের গলায় ছুরি চেপে ধরেছে একজন স্থানীয় ইন্ডিয়ান।

‘আরে, কী করছে!’ চেঁচিয়ে বলল রবিন।

রাস্টিসহ সবাই দৌড় দিল সেদিকে।

ওদের দেখে ছুরি নামাল ইন্ডিয়ান। অফিসারকে ছেড়ে দিল। ধূসর চুলে আঙুল চালাতে চালাতে হাসিমুখে বলল, ‘আরে, রাস্টি যে! কেমন আছ?’

‘ভালো,’ জবাব দিল রাস্টি।

রাস্টির দিকে অবাক চোখে তাকাল রবিন। ‘ওঁকে চেনেন?’

‘চিনি, বিশ বছর ধরে, সেই সোয়াম্পল্যান্ড গুডস খোলার সময় থেকেই। ও ডিন ওয়াটারম্যান।’

‘একটু আগে কী করছিলেন আপনি?’ ডিনকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

‘আমার গলায় ছুরি চেপে ধরে ডাকাতটা কীভাবে হুমকি দিচ্ছিল ডেপুটি ক্যানারকে দেখাচ্ছিলাম।’ ছুরিটা খাপে ভরে রাখলেন ডিন।

‘ডাকাত!’ ভুরু কুঁচকে গেছে রবিনের।

‘হ্যাঁ,’ ডিন জানালেন। ‘দুদিন আগে মায়ামির একটা ব্যাংকে পঞ্চাশ লাখ ডলার ডাকাতি হয়েছে। প্রচণ্ড ঝড় হচ্ছিল সে-সময়।’

‘কিন্তু আপনার গলায় ছুরি চেপে ধরেছিল কেন?’ জানতে চাইল রাস্টি।

‘পুলিশ রোড ব্লক দিয়েছিল। গাড়িতে করে পালাতে পারবে না বুঝে সোয়াম্পল্যান্ড গুডসে এসে ঢুকল ওরা। এখানে গাড়ি ফেলে আমার একটা এয়ারবোট নিয়ে পালিয়েছে। বোটের চাবি দেওয়ার জন্যে আমার গলায় ছুরি চেপে ধরেছিল।’

কিশোর ও রবিনের দিকে ফিরে রাস্টি বলল, ‘করাত-ঘাসের ভেতর দিয়ে সহজেই ছুটে যেতে পারে এয়ারবোট।’

‘জানি,’ মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ‘মাত্র কয়েক ইঞ্চি পানিতেও চলতে পারে।’

ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করছিলেন এতক্ষণ ডেপুটি শেরিফ গ্রেগ ক্যানার। পেনসিলের পেছনটা ঠুকলেন নোটপ্যাডে। ডিনকে বললেন, ‘চলুন, তদন্তটা সেরে ফেলা যাক। আপনি বলছিলেন ডাকাতদের চেহারা দেখতে পাননি।’

‘না, পাইনি। কালো হুড দিয়ে মুখ মাথা সব ঢেকে রেখেছিল,’ ডিন জবাব দিলেন।

‘ডাকাতদের বোটটা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ?’ কিশোর জানতে চাইল।

‘আমার এয়ারবোটটার কথা জিজ্ঞেস করছ তো?’ ভুরু কোঁচকালেন ডিন।

‘না,’ মাথা নাড়ল কিশোর। ‘আমি বলছি ডাকাতদের বোটটার কথা। এই জায়গাটার নাম ফ্রগ’স পেনিনসুলা, তাই তো?’ ডিন মাথা ঝাঁকালে আবার বলল কিশোর, ‘তার মানে এটা উপদ্বীপ। তিন পাশ থেকে ঘিরে রেখেছে পানি। পুলিশের তাড়া খেয়ে পেনিনসুলায় এসে আটকা পড়ত ডাকাতরা, যদি বোটে করে পালাতে না পারত।’

ভুরু উঁচু করলেন ডেপুটি ক্যানার। ‘ভালো কথা বলেছ তো! এটা তো ভাবিনি! খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।’ নোটবুকে দ্রুত নোট করে নিলেন তিনি। ‘প্রচুর রহস্য উপন্যাস পড়ো বুঝি?’

‘পড়ে মানে?’ রাস্টি বলল। ‘রহস্যের মধ্যেই বাস করে ওরা। রহস্যের সমাধান করা ওদের নেশা। রকি বিচে ওরা বিখ্যাত গোয়েন্দা। অসংখ্য জটিল রহস্যের সমাধান করেছে, পুলিশকে সহায়তা করেছে…’

রাস্টির প্রশংসা থামানোর জন্য তাড়াতাড়ি বাধা দিল কিশোর, ‘তবে এখানে রহস্য সমাধান করতে আসিনি আমরা, ছুটি কাটাতে এসেছি।’

খড়খড় করে উঠল স্কোয়াডকারের রেডিও-স্পিকার। গাড়ির জানালার কাছে গিয়ে কাত হলেন ডেপুটি ক্যানার। রেডিওতে পাঠানো মেসেজ শুনে নিয়ে ডিনকে জানালেন, ‘কোস্ট গার্ড। আপনার ছিনতাই হওয়া এয়ারবোটটার সন্ধান পাওয়া গেছে।’

‘কোথায়?’ ডিন জানতে চাইলেন।

‘ফ্লোরিডা বে’র পানির নিচে। ঝড়ে ডুবে গেছে। নিশ্চয় বেঘোরে মারা পড়েছে ডাকাতগুলো। তীর থেকে অত দূরে, দশ ফুট উঁচু ওই ঢেউয়ের মধ্যে বোট ডুবলে কোনোমতেই বাঁচা সম্ভব নয়। তার মানে, বোটের সঙ্গে সঙ্গে ডাকাতির মালও এখন সাগরের তলায়।’ স্কোয়াডকারে উঠলেন ক্যানার। ‘কথাটা গোপন রাখলে ভালো হয়। পঞ্চাশ লাখ ডলার পানির নিচে আছে শুনলে পঙ্গপালের মতো ছুটে যাবে মানুষ।’

স্কোয়াডকারটা চলে গেলে কিশোর বলল, ‘ম্যাপে দেখলাম, ফ্লোরিডা বে তো বিশাল।’

‘হ্যাঁ,’ মাথা ঝাঁকাল রাস্টি। ‘গাল্ফ অব মেক্সিকোর অংশই বলা চলে।’

‘ঝড়ের মধ্যে কোন সাহসে সাধারণ একটা এয়ারবোট নিয়ে খোলা সাগরে গেল ডাকাতেরা?’ নিজেকেই যেন প্রশ্ন করল কিশোর। চিমটি কাটল নিচের ঠোঁটে। ‘ঝড়ের মধ্যে উত্তাল সাগরে যে ওটা ডুবে যাবে, নিশ্চয় জানত ওরা।’

‘হয়তো কোনো দ্বীপে পৌঁছানোর চেষ্টা করছিল,’ রবিন বলল। ‘কিংবা কিউবায় যাবার মতলব করেছিল।’

‘মরিয়া হয়ে গেলে মস্ত ঝুঁকি নেয় মানুষ,’ রাস্টি বলল। ‘থাকগে, এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই, আমাদের নিজেদেরই অনেক কাজ পড়ে আছে। চলো, আস্তাবলে যাই।’ পার্কিং লটের পাশে লম্বা সরু একটা কাঠের ছাউনি দেখাল ও। পকেট থেকে এক টুকরো কাগজ বের করল। ‘রবিন, এই নাও, শপিং লিস্ট। স্টোরে গিয়ে জিনিসগুলো বের করো। মুসা…’ ঘুরে তাকিয়ে মুসাকে না দেখে থেমে গেল রাস্টি।

পার্কিং লটের পাশে জাঙ্কইয়ার্ডে মুসাকে দেখতে পেল রবিন। একটা পুরোনো মরচে পড়া গাড়ির সাইড মিররে ল্যাসো প্র্যাকটিস করছে।

জেনারেল স্টোরে ঢুকল রবিন। দরজার ওপরে ঝোলানো ঘণ্টা বেজে উঠল। লিস্ট দেখে প্রথমে টিনের খাবারগুলো বের করে কাউন্টারে জড়ো করতে লাগল ও। পেছনে আবার ঘণ্টা শুনে ফিরে তাকিয়ে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে লম্বা, পেশিবহুল একজন লোক। লাল চুল লাল দাড়ি এলোমেলো হয়ে আছে।

‘এই, স্নরকেলিং ইক্যুইপমেন্ট বিক্রি করো তোমরা?’ ভারী কণ্ঠস্বর লোকটার।

‘স্নরকেল!’ হাসল রবিন। ‘জলাভ‚মির ঘাসের দঙ্গলে ডাইভিঙের জায়গা কোথায়?’

লোকটা হাসল না। ‘আমি কি-ওয়েস্টে যাচ্ছি।’

‘সে তো বহুদূর। এখান থেকে কম করে হলেও একশ মাইল।’

রেগে উঠল লোকটা। ‘এত কথা বলো কেন? স্নরকেলিং ইক্যুইপমেন্ট আছে না নেই?’

‘আমি এই দোকানে চাকরি করি না।’ মাথা ঘুরিয়ে ইঙ্গিতে দোকানের পেছন দিক দেখাল রবিন। ‘ওখানে তাকের ওপর ডুবুরির যন্ত্রপাতি দেখেছি।’ নিজের কাজে মন দিল ও।

দরজার ঘণ্টা বাজল আবার। মাথা ঘুরিয়ে রবিন দেখে লোকটা চলে গেছে। কৌত‚হল হলো ওর। লোকটা কোথায় যায় দেখার জন্য দরজার বাইরে বেরিয়ে এল। ডকের শেষ মাথায় বাঁধা একটা এয়ারবোটে উঠতে দেখল ওকে। বোটে আরেকজন লোক দাঁড়ানো। এদিকে পেছন ফিরে আছে। চেহারা দেখা যাচ্ছে না। মাথায় একটা সাদা কাউবয় হ্যাট। ব্যান্ডে কালো আর কমলা রং করা পালক গোঁজা।

লাল চুলওয়ালা লোকটাকে ভালোমতো দেখার জন্যে ডকের দিকে এগোল রবিন। লোকটার ঘোঁৎ-ঘোঁৎ কানে এল, ‘নাহ্, এভাবে হবে না!’

সাদা হ্যাট পরা লোকটার চেহারা দেখার আর সুযোগ হলো না রবিনের। হঠাৎ গোড়ালিতে জড়িয়ে গেল কী যেন। হ্যাঁচকা টান লেগে পা’টা সরে গেল মাটি থেকে। উপুড় হয়ে পড়ে যাচ্ছে ও।

দুই

জলাভূমির ঘোলা নোনাপানিতে পড়ে গেল রবিন।

‘সরি, রবিন!’ ঝুঁকে একটা হাত বাড়িয়ে দিল মুসা। রবিনকে টেনে তুলল ডকের ওপর। ওর পা থেকে দড়ির ফাঁস খুলে নিল। ‘একটা সচল নিশানার ওপর প্র্যাকটিস করতে চেয়েছিলাম। গরুর কাছাকাছি, মানে, সচল প্রাণী বলতে একমাত্র তোমাকেই পেলাম।’

‘যাক, এত বড় একটা সম্মান দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ,’ তিক্ত কণ্ঠে বলল রবিন। ‘পরের বার দয়া করে আমাকে বাদ দিয়ে গরুর কাছাকাছি অন্য কোনো প্রাণী বেছে নিয়ো। দেখো তো, কেমন ভিজিয়ে দিয়েছ।’

আস্তাবলের দিক থেকে দৌড়ে এল কিশোর। ‘কী হয়েছে, রবিন?’

‘কিছু না,’ জবাব দিল রবিন। ‘ডুবুরির যন্ত্রপাতি কিনতে একটা লোক দোকানে ঢুকেছিল। লাল চুল লাল দাড়ি। বলল, কি-ওয়েস্টের দিকে যাচ্ছে। ডাইভিং ইক্যুইপমেন্ট আছে কিনা জিজ্ঞেস করল আমাকে। আমি বললাম, আমি এখানে চাকরি করি না। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল লোকটা। কোথায় যায় দেখার জন্যে আমিও বেরোলাম। একটা এয়ারবোটে উঠল ও। ওর সঙ্গে সাদা হ্যাট পরা আরেকজন লোক। হ্যাটের ব্যান্ডে কালো আর কমলা রঙের পালক গোঁজা।’

পানির ওপর দিয়ে তাকাল রবিন। সকালের সূর্য চোখে লাগছে। কপালে হাত রেখে আড়াল করল। ‘ওই যে, যাচ্ছে!’

সরু একটা খাঁড়ির দিকে এগোচ্ছে এয়ারবোট। কয়েকটা গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল।

‘খুব তাড়া মনে হচ্ছে ওদের,’ কিশোর বলল।

‘এই যে, নিয়ে এসেছি!’

রাস্টির ডাক শুনে ফিরে তাকাল ছেলেরা। দুটো ঘোড়া আর একটা খচ্চর নিয়ে এগোতে দেখল রাস্টি ও ডিনকে।

‘এত দূর থেকে এত পথ পাড়ি দিয়ে যখন এসেই পড়লে,’ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল রাস্টি, ‘আসল কাউবয় হওয়ার স্বাদটা নিয়েই যাও। উইকএন্ডের জন্যে ডিন তোমাদের এগুলো ধার দিয়েছে।’

ধূসর ঘোড়াটা ইঙ্গিতে দেখালেন ডিন। ‘ওর নাম গ্রে স্টোন।’ দ্বিতীয় ঘোড়াটা সাদা রঙের একটা পিন্টো, গায়ে ছোট ছোট বাদামি দাগ। ‘আর ও সোয়াম্প রাইডার।’

বিকট স্বরে হাঁক ছাড়ল খচ্চরটা। ‘আরে আস্তে, আস্তে।’ বুড়ো খচ্চরটার গলায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন ডিন। ‘এর নাম বুড়ো জন। রোডেওতে অংশ নিতে আসা লোকেরা আমার আস্তাবল খালি করে সব নিয়ে গেছে, রেখে গেছে একমাত্র এই বুড়োগুলোকেই।’

‘এতেই চলবে, মিস্টার ওয়াটারম্যান,’ রবিন বলল। ‘একটা কিছু তো পেলাম। পায়ে হেঁটে তো আর রোডেওতে যেতে হচ্ছে না।’

‘এরা এখানেই থাক। বিকেলবেলা এসে নিয়ে যেয়ো,’ রাস্টি বলল। ‘এখন চলো, ফিশিং ক্যাম্পে। পেটে খিদে নিয়ে নিশ্চয় অতিথিরা আমাদের পথ চেয়ে বসে আছে।’

দশ মিনিট পর হাইড্রোপ্লেন একটা ছোট দ্বীপের কিনারে নামল। গেটর সোয়াম্পের পানি এখানে মিলিত হয়েছে ফ্লোরিডা বে’র সঙ্গে। নদীর মোহনার মতোই জায়গাটা, জলাভ‚মির বাড়তি পানি সাগরে পড়ছে।

‘এই দ্বীপের নাম কালাহান’স-কি,’ গর্বের সঙ্গে জানাল রাস্টি। ‘আমার দাদার-দাদার নামের সঙ্গে মিলিয়ে একশ বছর আগে রাখা হয়েছিল এই নাম।’

নয়া চাঁদের মতো চেহারা দ্বীপটার। বালিতে ভর্তি। পূর্ব তীর ঘেঁষে খুঁটির ওপর বসানো ডজনখানেক কেবিন। ছোট দ্বীপটার নিচু উত্তরাঞ্চল ঘন করাত-ঘাসে ছাওয়া।

ভাসমান ডকের মুরিঙে প্লেন বাঁধতে বাঁধতে রাস্টি বলল, ‘কালাহান’স ফিশিং ক্যাম্পে স্বাগতম। এখানে ফিশিং ক্যাম্প করেছি বলে সবাই আমাকে পাগল ভাবে, কিন্তু আসল সমঝদাররা ঠিকই চিনে নিয়েছে জায়গাটা।’

‘আমার কিন্তু খুব ভালো লাগছে,’ চারপাশে তাকিয়ে বলল রবিন। ‘এত শান্ত। এত চুপচাপ।’

কিন্তু শান্ত পরিবেশ খানখান হয়ে গেল হঠাৎ গর্জে ওঠা শটগানের শব্দে।

‘কে গুলি করল?’ চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে মুসা।

‘নিশ্চয় হ্যারিস, আমার কেয়ারটেকার,’ উদ্বিগ্ন শোনাল রাস্টির কণ্ঠ। ‘ওর একটা শটগান আছে। কিন্তু কিসের ওপর গুলি চালাল তা তো বুঝতে পারছি না!’

‘চলুন, দেখি,’ বলে শব্দটা যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে ছুটতে শুরু করল কিশোর।

করাত-ঘাস গমখেতের মতো ঘন। ঘাসের ডগা কোথাও কোথাও সাত ফুট উঁচু। এর মধ্যে ঢুকে নিজেকে যেন হারিয়ে ফেলল কিশোর। চারপাশে ঘাস ছাড়া আর কোনো কিছুই চোখে পড়ছে না।

‘ওরে বাবারে, খেয়ে ফেললরে!’ চিৎকার শোনা গেল।

ঘাস ঠেলে সেদিকে ছুটল কিশোর। ঘাসের লম্বা পাতার ধারালো কিনারা হাতের চামড়ায় আঁচড় কাটছে। এসে পড়ল দাঁড়টানা ছোট একটা নৌকার কাছে। নৌকায় একজন লোক বসা। গালে ধূসর দাড়ি। হাতের শটগানের নল থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। থরথর করে কাঁপছে লোকটা।

মুসাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্টিও এসে দাঁড়াল। ‘কী হয়েছে, হ্যারিস!’

‘কুমির!’ নৌকার পাটাতনে ফেলে রাখা একটা দাঁড়ের অর্ধেকটা দেখাল ও, বাকি অর্ধেকটা নেই। ‘দেখুন, কীভাবে কেটেছে। ক্ষুরের মতো ধারালো দাঁত। আস্ত একটা দানব। পনেরো ফুটের কম না। একটা চোখ সাদা। এ রকম কুমির জীবনে দেখিনি আমি!’

কিশোর জানে, বদ্ধ জলাশয়ের এই কুমিরগুলো এক ভয়ংকর প্রাণী। স্থানীয় নাম অ্যালিগেটর। অন্যান্য বড় জাতের কুমিরের মতোই অনেক সময় মানুষখেকো হয়ে ওঠে এরা। তখন এদের হিংস্রতা সীমা ছাড়িয়ে যায়।

‘ওই দাঁড় দিয়ে আর নৌকা বাওয়া যাবে না,’ রাস্টি বলল। ‘নৌকাটা টেনে আনতে হবে।’

ঘাসের ওপর দিয়ে নৌকাটাকে ডাঙায় টেনে আনা হলো। ফিরে তাকাল কিশোর। দানবীয় কুমিরটা ওদের পিছু নিল কি না দেখল। কিন্তু স্থির হয়ে আছে পানি। দূরে একটা অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল হঠাৎ। পাশের একটা দ্বীপে পাশাপাশি দুটো সাইপ্রেস গাছ আছে, অবিকল একই রকম দেখতে। একটা গাছের উঁচু ডালে একজন মানুষ বসা। ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে মনে হলো।

‘মিস্টার কালাহান, ওই দ্বীপে কেউ থাকে?’ কিশোর জিজ্ঞেস করল।

কিশোরের দৃষ্টি অনুসরণ করে ফিরে তাকাল রাস্টি। ‘টুইন সাইপ্রেস-কি’তে? নাহ্, গত একশ বছর ধরে খালি পড়ে আছে। কেন?’

‘কিন্তু একটা লোক…’ থেমে গেল কিশোর। উধাও হয়ে গেছে লোকটা। ‘আশ্চর্য! এক সেকেন্ড আগেও তো ছিল!’

‘নিশ্চয় আজব কিটি,’ হ্যারিস বলল।

‘কী কিটি!’ ভুরু কুঁচকে তাকাল কিশোর।

‘আজব! আজব!’

‘তোমার কাছে আজব! আর তোমার কিছু মাথামোটা বন্ধুর কাছে!’ রেগে উঠল রাস্টি। ছেলেদের দিকে তাকাল। ‘ডিন ওয়াটারম্যানের নাতি কিটি। মিশুক না, এটা ঠিক। তবে আজব বলতে যা বোঝায়, তা-ও না। বেশিরভাগ সময় জলাভ‚মিতে কাটায়, পূর্বপুরুষদের মতো। শৌখিন মাছশিকারি আর টুরিস্ট এসে জায়গাটাকে যেভাবে ওলট-পালট করে দিচ্ছে, সেটা ওর পছন্দ না। টুইন সাইপ্রেস-কি’র একটা বিশেষ মর্যাদা আছে ওর কাছে।’

‘আরে,’ এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল কিশোর, ‘রবিন গেল কোথায়?’

‘রবিন!’ চিৎকার করে ডাকল মুসা। ‘কোথায় তুমি?’

‘এই যে এখানে,’ সাড়া দিল রবিন। ‘তোমরা কোথায়?’

শটগানের গুলির শব্দ শোনার মিনিটখানেক পর ঘাসের জঙ্গলে ঢুকেছিল ও। কোমরসমান উঁচু ঘাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে এখন। সঙ্গীদের কাউকে চোখে পড়ছে না। পানিতে একটা কাঠের টুকরো ভাসতে দেখে তুলে নিল। একটা দাঁড়ের অর্ধেকটা।

হুস করে পানির ওপর মাথা তুলল এক বিশাল কুমির। মস্ত হাঁ করে রবিনকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিল ওটা।

তিন

ভাঙা দাঁড় দিয়ে ঠেকানোর চেষ্টা করল রবিন। দাঁড়টা কামড়ে ধরল কুমির। মাথা ঝাঁকি দিয়ে হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিল। চিবিয়ে টুকরো টুকরো করে ফেলল।

লম্বা ঘাসের ভেতর দিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে ছুটল রবিন। ঠিক পেছনেই রয়েছে কুমিরটা। কোনোমতে এসে ডাঙায় উঠল ও। ফিরে তাকাল। ডাঙায় উঠল না আর কুমিরটা। জলাভ‚মির কালো ঘোলাপানির ভেতর তলিয়ে যাওয়ার আগে অদ্ভুত একটা সাদা চোখ দিয়ে রবিনের দিকে তাকিয়ে রইল যেন দীর্ঘ একটা মুহূর্ত।

রবিনের চিৎকার শুনে পানির কিনার ধরে দৌড় দিল কিশোর। কয়েক কদম পেছনে রয়েছে রাস্টি, মুসা আর হ্যারিস।

‘রবিন, কী হয়েছে?’ কাছে এসে জিজ্ঞেস করল মুসা।

‘আরেকটু হলেই কুমিরের নাশতা হয়ে যাচ্ছিলাম,’ হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিল রবিন।

এতক্ষণে কেয়ারটেকারের সঙ্গে ছেলেদের পরিচয় করিয়ে দেবার সুযোগ হলো রাস্টির। ‘ও হ্যারিস স্মিথ, ক্যাম্পের কেয়ারটেকার, এবং আমার স্টিয়ার-রোপিং পার্টনার।’

স্টিয়ার-রোপিং হলো গরুর গলায় ফাঁস পরানোর খেলা, জানে রবিন। হাত বাড়িয়ে দিল। ‘আমি রবিন।’

‘আমাকে শুধু হ্যারিস ডাকলেই চলবে। বিশ্বাস করো আর না করো, একটা কথা বলি, ওই দানব কুমিরটাকে আমাদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে আজব কিটি। অলৌকিক ক্ষমতা আছে ওর। জলাভ‚মির প্রাণীকে জাদু করে ওদের দিয়ে যা খুশি করাতে পারে।’

‘আবার শুরু করলে!’ হ্যাট দিয়ে হ্যারিসের কাঁধে আলতো বাড়ি মারল রাস্টি।

‘আজব কিটিটা কে?’ রবিন জানতে চাইল।

‘ডিন ওয়াটারম্যানের নাতি,’ জবাব দিল কিশোর। টুইন সাইপ্রেস-কি’তে গাছের ওপর ওকে কীভাবে বসে থাকতে দেখেছে, বলল।

‘কী হয়েছে?’ ভারী পুরুষকণ্ঠে হাঁক শোনা গেল। ফিশিং ক্যাম্পের দিক থেকে আসতে দেখা গেল একজন লোককে। মাথায় সোনালি চুল, নীল চোখ, পুরু গোঁফ। পেছন পেছন আসছে আরও চারজন, তাদের তিনজন পুরুষ, একজন মহিলা।

‘একটা কুমির আমাদের আক্রমণ করেছিল, মিস্টার বার্নার!’ জবাব দিল হ্যারিস। ‘বিশাল কুমির। দুটো ক্যানু জোড়া দিলেও অত লম্বা হবে না। আরেকটু হলেই আমাকে খেয়ে ফেলছিল!’ রবিনকে দেখাল ও। ‘ওকেও নাকি আক্রমণ করেছিল।’

পানির কিনারে গিয়ে দাঁড়ালেন বার্নার। নিচু হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কী যেন দেখতে লাগলেন। দুই হাতে লম্বা ঘাস সরিয়ে উঁকি দিলেন ভেতরে। ‘দেখে যাও।’

এগিয়ে গেল ছেলেরা। ঘাসের মধ্যে মরা পাতা আর জলজ ঘাস জড়ো করে রাখা হয়েছে।

‘কুমিরের বাসা!’ চিনতে পেরে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল কিশোর। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে ও দেখেছে এ রকম বাসা।

‘আশপাশে একটা মা-কুমির আছে,’ মিস্টার বার্নার বললেন। ‘ওই পাতার নিচে ডিম আছে। ডিমের কাছে কাউকে আসতে দেখলেই তেড়ে আসছে।’

‘আশ্চর্য!’ রাস্টি বলল। ‘সাগরের এত কাছে তো কখনো ডিম পাড়ে না কুমির। পানি এখানে অতিরিক্ত নোনা। আমি তো জানতাম, জলাভ‚মির দুর্গম জায়গায় মানুষ ও বোটের কাছ থেকে দূরে কোথাও ডিম পাড়ে ওরা।’

‘ঠিকই জানেন,’ বার্নার বললেন। ‘কিন্তু এই বিশেষ কুমিরটা যেকোনো কারণেই হোক দ্বীপের এই কিনারটাকে ডিম পাড়ার জন্যে বেছে নিয়েছে।’

‘তার মানে কুমিরটা মানুষখেকো,’ হ্যারিস বলল। ‘মানুষকে ভয় পায় না বোঝাই যাচ্ছে। খুঁজে বের করে ওটাকে মেরে ফেলা দরকার।’

‘সমস্যাটা নিয়ে পরে ভাবা যাবে,’ রাস্টি জবাব দিল। ‘দুপুর হয়ে গেছে। চলো, কেবিনে যাই। খেয়ে নিয়ে রোডেওতে যেতে হবে।’

শুকনো কাপড় পরল ছেলেরা। তাজা ট্রাউট ভাজা আর জইয়ের রুটি দিয়ে লাঞ্চ সারল। তারপর রাস্টির চ্যাপ্টা তলাওয়ালা পন্টুন বোটে উঠল। ফিশিং ক্যাম্প থেকে অতিথিদের মেইনল্যান্ডে আনা-নেওয়া করে এই ফেরিবোট।

ক্যাম্পে আরও কয়েকজন অতিথির সঙ্গে তিন গোয়েন্দার দেখা হলো। তাদের মধ্যে আছে টনি ও রনি ওয়াকার নামে দুই ভাই, আর হার্ভে কাসনার নামে এক লোক। রোডেওতে প্রতিযোগিতা করতে এসেছে এদের বেশির ভাগই। কাফ-রোপিং, অর্থাৎ বাছুরের গলায় ফাঁস পরানোর খেলায় অংশ নেবে টনি ও রনি। ব্রঙ্কো বাস্টিং মানে বুনো ঘোড়াকে পোষ মানানোর খেলায় অংশ নেবে হার্ভে কাসনার। আর গুজ বার্নার হবে ওয়াইল্ড-বুল রাইডার-খেপা-ষাঁড়ের পিঠে চড়ে টিকে থাকার খেলা।

সোয়াম্পল্যান্ড গুডস-এ পৌঁছাল ফেরিবোট। রোডেও গ্রাউন্ডে যাওয়ার জন্য অতিথিদের নিয়ে ওয়াটারম্যানের পিকআপ ট্রাকের পেছনে চড়ল রাস্টি। ছেলেদের উদ্দেশে চিৎকার করে বলল, ‘আমরা গেলাম। তোমরা এসো।’

ধুলো উড়িয়ে ছুটল ট্রাক।

দুটো ঘোড়া আর খচ্চরের মধ্যে কে কোনটাতে চড়ে যাবে, এ নিয়ে কোনো ওজর-আপত্তি হলো না। নিজের ইচ্ছেতেই বুড়ো জনের পিঠে চড়ল মুসা।

ভালোমতো ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে তিনটে জানোয়ারকেই। দুই লেনের রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় গাড়ি, ট্রাক কিংবা ঘোড়ায় টানা গাড়িগুলোর কাছে ঘেঁষল না। দূর দিয়ে এগিয়ে চলল। রাস্তার গাড়িঘোড়াগুলো সব সোয়াম্পল্যান্ড রোডেওতে চলেছে।

চলতে চলতে রাস্তায় মাইলফলক চোখে পড়লেই ল্যাসো ছুড়ছে মুসা।

‘কেমন বুঝছ?’ ছয় নম্বর মাইলফলকটা থেকে ফাঁস খুলে নিয়ে হাসিমুখে দুই বন্ধুর দিকে তাকাল মুসা।

‘মুসা, তোমার এই ল্যাসো ছোড়া বন্ধ করো,’ অধৈর্য হয়ে বলল রবিন। ‘যে হারে সময় নষ্ট করছ, প্রতিযোগিতার পুরোটাই মিস করব আমরা।’

বিনা প্রতিবাদে দড়িটা কুণ্ডলী পাকিয়ে রেখে দিল মুসা। বাকি পথ আর একবারের জন্যও খুলল না।

রোডেওতে রাস্টি আর হ্যারিসের সঙ্গে দেখা হলো ওদের। দ্রুত রোডেও গ্রাউন্ডটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য নিয়ে চলল রাস্টি। জানাল, জায়গাটার মালিক ক্লিন্ট গিবসন নামের একজন কোটিপতি। একটা ক্যাট্ল র‌্যাঞ্চের কিছুটা অংশকে আলাদা করে প্রতিবছর রোডেওর আয়োজন করেন। এ সময় ট্রাক ভর্তি করে রোডেওর জন্য জিনিসপত্র আর গরু-ঘোড়া নিয়ে আসা হয়। মেইন রোডেও রিঙের চারপাশ ঘিরে দর্শকদের জন্য জায়গা করে দেওয়া হয়েছে, এর নাম গ্র্যান্ডস্ট্যান্ড। রিঙের একপাশে বিশাল সামিয়ানা টাঙানো।

‘ওখানে কী?’ রবিন জানতে চাইল।

‘ফার্মের জিনিসপত্রের প্রদর্শনী, রোডেও রেজিস্ট্রেশন টেবিল, খাবারের দোকান এসব। আয়োজনটা সব মিলিয়ে সেই পুরোনো দিনের কার্নিভালের মতো।’

‘দূরের ওই বিল্ডিংগুলো কিসের?’ হ্যারিসকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

‘একটা গোলাঘর। বাকিগুলোতে বাঙ্কহাউস, রোডেও রাইডারদের জন্যে,’ হ্যারিস বলল। ‘পার্কিং লটের শেষ মাথায় ট্রেইলারগুলোতে থাকেন বিচারক ও রোডেও ভাঁড়েরা।’

মূল সামিয়ানাটায় ঢুকল ওরা। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হলে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে নিতে হয়। রাস্টি আর হ্যারিস লাইনে দাঁড়াল। গিজগিজ করছে কাউবয় আর দর্শক। সেদিকে তাকিয়ে রবিন জিজ্ঞেস করল, ‘প্রতিযোগীরা কোনখান থেকে আসে?’

‘বেশির ভাগই স্থানীয়, ফ্রগ’স পেনিনসুলার বাসিন্দা,’ রাস্টি জানাল। ‘বাকিরা পেশাদার, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা। রোডেও হবে শুনলেই ছোটে, যেখানেই হোক।’

‘মাত্র দশ ডলার কম, মিস্টার গিবসন,’ সারির সামনে থেকে চেঁচিয়ে বলল লম্বা, হালকা-পাতলা একটা টিনএজ ছেলে।

‘সরি, ইয়াং ম্যান,’ জবাব দিলেন সাদা চুল আর গালে পোড়া দাগওয়ালা একজন ভদ্রলোক। তিনিই মিস্টার গিবসন। ‘কাল রাতে বুল-রাইডিং শুরু হওয়ার আগে যদি দশ ডলার পূরণ করে দিতে পারো, তোমাকে আমি খেলায় নেব, যাও, কথা দিলাম। কিন্তু আজ রাতে শুধু ব্রঙ্কো বাস্টিঙেই খেলতে হবে তোমাকে।’

‘ঠিক আছে!’ হতাশ ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলল ছেলেটা। বারবার একটা মুদ্রা টোকা দিয়ে শূন্যে ছুড়ে লুফে নিচ্ছে।

রেজিস্ট্রি খাতায় নাম লিখে নিয়ে একটা অফিশিয়াল নম্বর দিলেন ওকে মিস্টার গিবসন।

ছেলেটা ফিরে তাকাতেই রবিনের সঙ্গে চোখাচোখি হলো। ‘কী দেখছ?’ ভুরু নাচাল ছেলেটা। মারমুখো ভঙ্গি। হতাশায়ই বোধহয়।

‘কিছু না,’ ঝামেলা এড়ানোর জন্য বলল রবিন।

‘দাঁড়াও না, আজ রাতে সবাইকে দেখিয়ে দেব আমি,’ অহংকার ফুটে বেরোচ্ছে ছেলেটার চেহারায়। ‘ব্রঙ্কো-রাইডিং প্রতিযোগিতায় জিতবই।’

আবার মুদ্রাটা ওপরে ছুড়ে দিল ও। সোনার মোহর, চিনতে পারল রবিন। চোখ বড় বড় হয়ে গেল ওর। পকেটে টাকা নেই, দশ ডলারের জন্য খেলায় অংশ নিতে পারছে না, অথচ সোনার মোহর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!

‘আমার নাম বিল ওয়াটমোর। বোর্ডের লিস্টে একেবারে প্রথম দিকে দেখতে পাবে আমার নাম।’ অহংকারী ভঙ্গিতে চোখা চোয়ালটা উঁচু করে ধরল ছেলেটা। ‘কারণ, আমি জিতবই।’

কিশোর লক্ষ করল, কাছেই একটা স্যুভেনির স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে গুজ বার্নার স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে। এগিয়ে এল, ‘এই ছেলে, বেশি বড় বড় কথা হয়ে যাচ্ছে না?’

‘আমি ছেলে নই, মিস্টার,’ ভুরু কুঁচকে তাকাল বিল। ‘ছেলে বলার বয়েস পার হয়ে এসেছি। কে আপনি?’

‘আমার নাম গুজ বার্নার। আমি একজন ব্রঙ্কো বাস্টার। গত বছর নর্থ ডাকোটার ফার্গোতে দেখেছি তোমাকে, তাই না?’

‘অ্যাঁ!’ হঠাৎ করেই আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলল যেন বিল।

‘আমি প্রথম হয়েছিলাম,’ হাসিমুখে বলল বার্নার। ‘যে রকম বড়াই করছ, ওর অর্ধেক ক্ষমতাও যদি তোমার থাকে, স্পনসরের অভাব হবে না তোমার। প্রতিযোগিতার জন্যে তোমার রেজিস্ট্রেশনের টাকাটা দিয়ে দেবে। তবে তোমার পুরস্কারের টাকা থেকে একটা ভাগ অবশ্যই কেটে নেবে।’

‘স্পনসর পাওয়ার উপযোগী আমি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই,’ আত্মবিশ্বাস ফিরে এল আবার বিলের।

‘চলো দেখি, তোমার জন্যে একজন স্পনসর খুঁজে বের করা যায় কি না,’ বার্নার বলল।

‘আপনি রেজিস্ট্রি করাবেন না?’ জিজ্ঞেস করল হ্যারিস।

‘পরেও করতে পারব।’ বিলের কাঁধে হাত রাখল বার্নার। ওকে নিয়ে চলে গেল।

‘বেশি অহংকার,’ ছেলেটার কথা বলল রাস্টি। রেজিস্ট্রেশন টেবিলের সামনে পৌঁছে গেছে।

‘তাড়াতাড়ি যান,’ রাস্টির হাতে একটা নম্বরের টিকিট ধরিয়ে দিয়ে গিবসন বললেন। ‘আপনার খেলা পনেরো মিনিটের মধ্যেই শুরু হবে।’

‘আমি যাচ্ছি, পরে দেখা হবে,’ কিশোরদের দিকে ফিরে বলল রাস্টি।

‘গুড লাক!’ রবিন বলল।

তাড়াহুড়া করে চলে গেল রাস্টি।

‘আমার গলা শুকিয়ে গেছে,’ কিশোর বলল। ‘কোকটোক কিছু খাওয়া দরকার। তোমরা খাবে?’

‘খাব তো বটেই,’ মুসা জবাব দিল। ‘সবচেয়ে বড়টা।’

‘তোমরা যাও, আমি নিয়ে আসছি।’

মুসাকে নিয়ে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে এগোল রবিন।

কোকের জন্য কনসেশন স্ট্যান্ডের লাইনে দাঁড়িয়েছে কিশোর, সামনে দুজন রোডেও প্রতিযোগী তরুণের কথা কানে এল। হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া শীতকালের ঝড়ে ফ্লোরিডা বে’তে ডুবে যাওয়া ব্যাংক ডাকাতেরা মরে গেছে না বেঁচে আছে, এ নিয়ে তর্ক করছে লোকগুলো। কিশোরও তাতে যোগ দিল। কাউন্টারের কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে এতটাই খাতির জমিয়ে ফেলল লোকগুলোর সঙ্গে, সেদিন বিকেলে রোডেও প্রতিযোগিতার পর সামিয়ানার পেছনে বারবিকিউতে দাওয়াত পেয়ে গেল।

বড় বড় তিনটে কোকের বোতল হাতে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে এগোনোর সময় রাস্টির ফিশিং ক্যাম্প থেকে আসা তিনজন অতিথিকে গভীর মনোযোগে আলোচনা করতে দেখল কিশোর। কানে এল, রনি ওয়াকার বলছে, ‘জলাভ‚মিতে একটু ঘুরে বেড়ানোর ইচ্ছে ছিল আমার আর টনির, কিন্তু কুমিরটার জন্যে সাহস পাচ্ছি না।’

কুমিরের কথা শুনে কান খাড়া করে ফেলল কিশোর।

‘বেশি সাহস না করাই ভালো,’ বার্নার বলল।

‘আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারি,’ ভারী একটা কণ্ঠ ওদের পেছন থেকে বলল। লাল দাড়িওয়ালা একজন লোক সামনে এগিয়ে এল। ‘আমার নাম মরিস মরিসন। সারা জীবন কুমির ঘাঁটাঘাঁটি করেছি।’ ডান হাতটা উঁচু করে দেখাল ও। কড়ে আঙুলের পুরোটা আর ওর পাশের আঙুলের অর্ধেকটা নেই। ‘পঞ্চাশ ডলার ফি আর দুই রাত সময় দিলে কুমির সমস্যার সমাধান আমি করে দিতে পারি।’

‘স্পেশাল পারমিশন ছাড়া এখানে কুমির মারা বেআইনি,’ টনি ওয়াকার বলল।

‘কুমির মারার কথা কে বলছে। আমি ওটাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জলাভ‚মির নির্জন কোনো জায়গায় রেখে আসব।’

‘তাহলে পঞ্চাশ ডলার খরচ করা যায়।’ রনি-টনির দিকে তাকাল বার্নার। মানিব্যাগ বের করল। ‘টাকাটা আমিই দিচ্ছি।’

‘তবে আমার একটা অনুরোধ আছে,’ মরিস বলল। ‘আমি রাতের বেলা কাজ করব। ওই সময় আমার আশপাশে ঘুরঘুর করা চলবে না। বেশি লোকজন দেখলে কুমিরটা লুকিয়ে পড়বে। মাঝরাতের পর থেকে কারফিউ জারি করলাম-গেটর সোয়াম্পের ধারেকাছে যাবেন না কেউ।’

তিনজনেই মরিসের কথায় রাজি। থেমে দাঁড়িয়েছিল, আবার গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের দিকে পা বাড়াল কিশোর। মুসা আর রবিনকে পাওয়া গেল। কিশোর বলল, ‘রবিন, তোমার সেই লাল দাড়িওয়ালা লোকটাকে দেখলাম। কুমিরটাকে সরানোর জন্যে তাকে নিয়োগ করেছে গুজ বার্নার।’

‘কুমিরশিকারি নাকি লোকটা?’ রবিনের প্রশ্ন। ‘আমি তো ভেবেছিলাম ও ডুবুরি। স্নরকেল পরে পানিতে ডুব দেয়।’

মাথা ঝাঁকাল কিশোর। ‘আমার মনে হয়, দুটোই। কুমিরও শিকার করে, আবার ডুবুরিও। কিন্তু তুমি না বললে কি-ওয়েস্টের দিকে চলে গেছে লাল দাড়িওয়ালা লোকটা?’

ঠিক এই সময় গেট খুলে গেল। ঘোড়ার পিঠে চড়ে শ্যুট থেকে বেরিয়ে রিঙে ঢুকল প্রথম ব্রঙ্কো রাইডার।

‘বিল ওয়াটমোর!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

পিঠ বাঁকিয়ে লাফানো শুরু করল ঘোড়াটা। অনবরত পেছনের দুই পা ছুড়ছে। চাবুকের মতো সামনে পেছনে ঝাঁকি খাচ্ছে ওর পিঠে বসা আরোহী। কিন্তু পড়ছে না। শক্ত হয়ে পিঠে চেপে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর ঘণ্টা বাজিয়ে ওকে যোগ্য এবং পরের খেলার জন্য নির্বাচিত ঘোষণা করা হলো।

লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল বিল। আস্তে করে পা রাখল পুরু ধুলোয় ঢাকা রিঙের মাটিতে। স্বচ্ছন্দ ভঙ্গি। ঢোলা পোশাক পরা, মুখে রং মাখা দুজন ভাঁড় বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করতে করতে ছুটে এসে দু’পাশ থেকে লাগাম ধরে ঘোড়াটাকে সরিয়ে নিয়ে গেল।

‘মুসা, ল্যাসো ছুড়তে যদি হাত কাঁপে তোমার, ওদের সঙ্গে যোগ দিতে পারো,’ ভাঁড়দের দেখিয়ে রসিকতা করল রবিন।

‘না জেনে কথা বোলো না,’ ঝাঁজিয়ে উঠল মুসা। ‘রোডেও ভাঁড় হওয়া অত সোজা না। ভীষণ কঠিন কাজ। আর খুবই বিপজ্জনক। ওস্তাদ লোক ছাড়া ভাঁড় হতে পারে না।’

দর্শকদের উদ্দেশে বাউ করল বিল। হ্যাট তুলে নাড়ল। রবিন লক্ষ করল, হ্যাটটা সাদা। ব্যান্ডে কমলা ও কালো রঙের পালক পরানো। এয়ারবোটে মরিস মরিসনের সঙ্গে যে লোকটাকে দেখেছিল, তার মাথায়ও এ রকম হ্যাট পরা ছিল।

‘রাস্টি আসছে!’ চেঁচিয়ে উঠল মুসা।

শ্যুটের ভেতর দেখা যাচ্ছে রাস্টিকে। ব্ল্যাক ডেভিল নামে একটা কালো ঘোড়ার পিঠে বসে আছে। দরজা খুলে গেল। পা ছুড়তে ছুড়তে বেরিয়ে এল ঘোড়াটা। ‘কালো শয়তান’ই। নামের সঙ্গে স্বভাবের মিল আছে। পাক খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে আরোহীকে পিঠ থেকে ফেলে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু লাগাম ধরে শক্ত হয়ে বসে থাকল রাস্টি। মজা পেয়ে একনাগাড়ে চিৎকার করছে বাচ্চা ছেলের মতো। নির্বাচিত ঘোষণা করা হলো ওকেও। ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এল ও। বিপুল করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানাল দর্শকেরা। এ অঞ্চলে প্রচুর ভক্ত আছে ওর, বোঝা গেল।

‘হ্যারিকেনে চড়ে আসবে এখন কিটি ওয়াটারম্যান,’ ঘোষণা দিলেন মিস্টার গিবসন। মুহূর্তে হট্টগোল থেমে গেল। চুপ হয়ে গেল দর্শক।

‘কিটি ওয়াটারম্যান?’ রবিন বলল, ‘কিশোর, হ্যারিসের আজব কিটি না তো? টুইন সাইপ্রেস কিতে যে লোকটাকে দেখেছিলে?’

কিশোর জবাব দেওয়ার আগেই ঝটকা দিয়ে খুলে গেল শ্যুটের দরজা। শূন্যে পা ছুড়তে ছুড়তে তীব্র গতিতে বেরিয়ে এল আরেকটা ঘোড়া। ভীষণ বেয়াড়া। প্রচন্ড ঝাঁকি দিয়ে আরোহীকে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু আরোহীও কম না। জোঁকের মতো লেগে রইল ঘোড়ার পিঠে। নির্বাচিত ঘোষিত হওয়ার ঘণ্টা বাজতেই আলগোছে লাফ দিয়ে নেমে এল ঘোড়ার পিঠ থেকে, তিন গোয়েন্দার একেবারে সামনে।

শীতল কালো চোখ মেলে ছেলেদের দিকে তাকিয়ে রইল কিটি। দর্শকদের করতালি থেমে এলে লাফিয়ে রিঙের বেড়া ডিঙাল ও, তিন গোয়েন্দার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘গেটর সোয়াম্প থেকে দূরে থেকো, নইলে…’ নইলে কী হবে মুখে না বলে হাত দিয়ে গলায় পোঁচ মেরে বুঝিয়ে দিল।

চার

‘এই শোনো, দাঁড়াও!’ চেঁচিয়ে উঠল রবিন।

কিন্তু ফিরল না কিটি। রিঙের উল্টো দিকের একটা গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল।

‘আচ্ছা, হচ্ছেটা কী, বলো তো?’ মুসার প্রশ্ন।

‘জানি না, তবে জানার চেষ্টা করতে যাচ্ছি। তুমি এখানে থাকো,’ বলে রবিনকে নিয়ে দর্শক বেরোনোর গেটের দিকে ছুটল কিশোর।

বেরিয়ে এসে কিটিকে কোথাও দেখল না। লাল রঙের চওড়া কানাওয়ালা হ্যাট পরা একজন ভাঁড়কে চোখে পড়ল রবিনের, ব্ল্যাক ডেভিলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে গোলাবাড়ির কাছে আস্তাবলে।

কিটির চেহারা ও পোশাকের বর্ণনা দিয়ে ওরকম কাউকে যেতে দেখেছে কি না লোকটাকে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

আঙুল তুলে গোলাঘরের পেছনের একটা মাঠ দেখাল ভাঁড়।

দূরের বনের দিকে একজন মানুষকে চলে যেতে দেখল কিশোর।

‘জলাভূমিতে যাচ্ছে,’ ভাঁড় জানাল। ‘ওর পিছু নিয়ে লাভ নেই।’

‘কেন?’ মাঠের ওপাশে বনের ভেতর কিটিকে চলে যেতে দেখছে কিশোর।

‘ধরতে পারবে না, তার কারণ,’ ভাঁড় জবাব দিল, ‘এখানকার জলাভ‚মির প্রতিটি ইঞ্চি ওর চেনা। কোথায় সাপ, কোথায় কুমিরের বাসা, কোথায় চোরাবালি, সব জানে। ওই জলাভ‚মিতে তোমরা পাঁচ মিনিটও টিকতে পারবে না।’

‘মনে হয় ঠিকই বলছে, কিশোর,’ রবিন বলল। ‘অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। কিটিকে খুঁজে পাব না আমরা।’

‘কিটিকে তার মানে আপনি ভালো করেই চেনেন?’ ভাঁড়কে জিজ্ঞেস করল কিশোর।

‘সারা জীবন এখানে কাটিয়েছি, চিনব না। ও, আমার নাম ডিক, ডিক টোম্যান।’

আচমকা বিরক্ত ভঙ্গিতে চেঁচিয়ে উঠল ব্ল্যাক ডেভিল। পেছনের পায়ে খাড়া হয়ে যেতে চাইছে। তাড়াতাড়ি ঘোড়াটাকে শান্ত করার চেষ্টা করল টোম্যান। ‘সরি, এখন আর কথা বলতে পারব না। ঘরে যাওয়ার জন্যে অস্থির হয়ে গেছে ও।’ মস্ত হ্যাটের কানা ছুঁয়ে মৃদু বাউ করল ভাঁড়। ঘোড়াটাকে টেনে নিয়ে গোলাঘরের দিকে চলে গেল।

মুসাও চলে এসেছে ততক্ষণে। কিশোর বলল, ‘গেটর সোয়াম্পে কিছু একটা ঘটছে।’

‘কী ঘটছে?’ মুসার প্রশ্ন।

পঞ্চাশ ডলারের বিনিময়ে কুমিরটাকে সরিয়ে দেওয়ার চুক্তি করেছে মরিস, দু’রাত কাউকে জলাভূমিতে যেতে নিষেধ করেছে, এ কথা দুই সহকারীকে জানাল কিশোর। তারপর বলল, ‘মরিসের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে হবে। রবিন, তোমরা দুজন বিল ওয়াটমোরের ব্যাপারে জানার চেষ্টা করো। মরিসের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা কী, বোঝা দরকার। আমি মরিসের খোঁজ নেব।’

পরের একটি ঘণ্টা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিল কিশোর। অনেককেই জিজ্ঞেস করল মরিস মরিসনকে চেনে কি না। ফ্রগ’স পেনিনসুলার স্থানীয় কেউ তো চেনেই না, বাইরে থেকে রোডেও রাইডে অংশগ্রহণ করতে আসা কেউও চেনে না ওকে।

রবিন আর মুসা ওদিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে, সামিয়ানার ভেতর। অবশেষে রেজাল্ট বোর্ডের সামনে এসে বিলকে পেল, যেখানে ব্রঙ্কো-রাইডিঙে অংশগ্রহণকারীদের নামের তালিকা টানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

‘এই, বিল,’ ডাক দিল রবিন।

ফিরে তাকাল বিল। ‘ও, তোমরা।’

‘তোমার খবর কী?’ জানতে চাইল মুসা।

‘আর বোলো না,’ বিড়বিড় করল বিল। ‘দেখো না কী কাণ্ড করে রেখেছে!’

বোর্ডের দিকে তাকাল রবিন। প্রথম দুজন রাস্টি কালাহাল ও কিটি ওয়াটারম্যান। বিলের নাম বারো নম্বরে। রবিন জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে এত নিচে নামাল কেন? ঘণ্টা না বাজানো পর্যন্ত তো টিকেই ছিলে।’

‘শুধু টিকে থাকলেই হয় না, আরও অনেক ব্যাপার আছে। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকার ভঙ্গি, কতটা সাবলীল, কেমন ঘোড়া, এ রকম নানা জিনিস বিবেচনায় আনা হয়।’

‘তোমরা এখানে!’ তাড়াহুড়া করে ওদের কাছে এসে দাঁড়াল রাস্টি। ‘সোয়াম্পল্যান্ড গুডসে ফিরে যাচ্ছি আমরা। এখুনি যেতে হবে।’

‘আমাদের বয়েসীরা একটা বারবিকিউর ব্যবস্থা করেছে,’ মুসা জানাল। ‘দাওয়াতও পেয়েছি। যোগ দিতে চাচ্ছিলাম।’

‘আমার তো কোনো তাড়া নেই,’ রাস্টি জবাব দিল। ‘কিন্তু অতিথিরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। পন্টুন বোটে আমাদের সঙ্গে ফিশিং ক্যাম্পে না গেলে এখানে আটকে পড়বে তোমরা। যাওয়ার আর কোনো ব্যবস্থা নেই।’

‘আমি ওদের পৌঁছে দিতে পারি,’ বিল বলল। ‘সোয়াম্পল্যান্ড গুডসে আমার একটা বোট বাঁধা আছে। কালাহান’স ফিশিং ক্যাম্পে যাবে তো ওরা? যাওয়ার সময় আমার পথেই পড়বে।’

‘বাড়ি কোথায় তোমার?’

‘ফ্রগ’স পেনিনসুলাতেই।’

‘গেটর সোয়াম্প পাড়ি দিয়ে বোটে করে সোয়াম্পল্যান্ড গুডস হয়ে এসেছ?’ অবাক মনে হলো রাস্টিকে। ‘ফ্রগ’স পেনিনসুলা থেকে হেঁটেও তো এর অর্ধেক সময়ে এখানে চলে আসা যায়।’

জবাব দেওয়ার আগে দ্বিধা করল বিল। ‘জলাভূমি দিয়ে বোটে চলাচল করতে আমার ভালো লাগে।’

সন্দিহান চোখে বিলের দিকে তাকিয়ে রইল রাস্টি। রবিন লক্ষ করল, অস্বস্তি বোধ করছে বিল। ওর কাছ থেকে তথ্য জানার সুযোগটা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ তোমাকে, বিল। তোমার সঙ্গেই যাব আমরা। গেটর সোয়াম্প হয়ে বোটে করে যাওয়াটা নিশ্চয়ই খুব মজার।’

‘যা-ই করো, মাঝরাতের আগে যাবে,’ রাস্টি বলল। ‘কুমিরটাকে সরানোর জন্য টাকা নিয়েছে মরিস। মাঝরাতের পর আর জলাভ‚মিতে থাকা চলবে না।’ পার্কিং লটের দিকে হাঁটতে শুরু করল ও।

‘বাঙ্ক-হাউসে গিয়ে চট করে গোসলটা সেরে আসি,’ বিল বলল। ‘বারবিকিউতে দেখা হবে তোমাদের সঙ্গে।’

বিল চলে গেলে রবিনের দিকে তাকাল মুসা। ‘মরিসের কথা বিলকে জিজ্ঞেস করলে না যে?’

‘করতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু পরে ভাবলাম বিলের সন্দেহ হয়ে গেলে শেষে কোনো প্রশ্নেরই জবাব দেবে না।’

মাথা ঝাঁকাল মুসা। ‘তা ঠিক।’

‘প্রথমে এখন কিশোরকে খুঁজে বের করতে হবে,’ রবিন বলল। ‘ও কী জানল, শুনি।’

গরুর খুপরিগুলোর কাছে পাওয়া গেল কিশোরকে। দুজন রোডেও শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলছে। রবিন আর মুসাকে দেখে সরে এল কিশোর। ‘এখানে মরিস মরিসনকে কেউ চেনে না।’

বিলের সন্দেহজনক আচরণের কথা কিশোরকে জানাল রবিন। ‘আমার মনে হয় গেটর সোয়াম্পে অবৈধ কিছু একটা করছে বিল আর মরিস মিলে।’

‘বেআইনিভাবে কুমির শিকার করছে হয়তো,’ কিশোর বলল। ‘কুমিরের চামড়ার অনেক দাম, চোরাই বাজারে বিক্রি করে।’ চিন্তিত ভঙ্গিতে নিচের ঠোঁটে চিমটি কাটল ও। ‘জলাভূমিতে গিয়ে দেখা দরকার।’

‘আপাতত জলাভ‚মির কথা বাদ। বারবিকিউতে যাই, চলো,’ বলল মুসা।

সামিয়ানার পেছনে গনগনে অগ্নিকুণ্ড ঘিরে বসেছে বেশ কিছু তরুণ-তরুণী। রোডেও শ্রমিকেরা খুঁটির মাথায় আলো জ্বেলে দিয়েছে। মস্ত দুটো সিকে গেঁথে গরুর আস্ত রান কয়লার আঁচে পুড়িয়ে কাবাব বানানো হচ্ছে। সুগন্ধ ভুরভুর করছে বাতাসে।

ডেপুটি শেরিফ গ্রেগ ক্যানারকে দেখা গেল ওখানে। পরনে এখন ইউনিফর্ম নেই। সাদা শার্ট, নীল জিনস আর কাউবয় বুট পরেছেন। কথা বলছেন মিস্টার গিবসনের সঙ্গে। কিশোরদের দেখে হাত নাড়লেন।

হাতে একটা ছোট সাইজের কাবাবের সিক নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল বিলকে। থেকে থেকেই সোনার মোহরটায় টোকা দিয়ে শূন্যে ছুড়ছে। ‘বুনো ষাঁড়কেও পরোয়া করি না আমি,’ বড়াই করছে ও। ‘কাল দেখো। ব্ল্যাক সাইক্লোনের পিঠে চড়ব।’

‘মিস্টার বার্নার তার মানে একজন স্পনসর জোগাড় করে দিয়েছেন তোমাকে,’ বিলের কাছে গিয়ে দাঁড়াল কিশোর।

‘হ্যাঁ।’

মোহরটার দিকে ইঙ্গিত করে কিশোর বলল, ‘ওটা কী? তোমার সৌভাগ্যের প্রতীক?’

‘অ্যাঁ? হ্যাঁ, সৌভাগ্যের প্রতীক।’ হাতের মুঠো বন্ধ করে মোহরটা লুকিয়ে ফেলল বিল, যাতে কিশোর আর দেখতে না পায়।

অন্ধকার ছায়া থেকে ক্যাম্পফায়ারের আলোয় বেরিয়ে এল লম্বা, টাকমাথা, কালো চশমা পরা একজন মানুষ। বিলকে বলল, ‘হ্যাঁ, লুকিয়ে ফেলো, খোয়া যাওয়ার আগেই।’

মোহরটা পকেটে ভরল বিল। কিশোরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল, ‘ইনি আমার স্পনসর, মিস্টার ফক্স ডেনভার।’

হাত বাড়িয়ে দিল কিশোর। কর্কশ হাতে কিশোরের হাতটা চেপে ধরে ডেনভার বলল, ‘মাছধরা আমার পেশা। রোডেওতে আসি বিনোদনের জন্যে। তোমরা বিলের বন্ধু নাকি?’

‘বলতে পারেন। অবশ্য আজই ওর সঙ্গে পরিচয় হলো।’

‘ও। তার মানে আমার মতোই নতুন পরিচয়।’

‘হ্যাঁ,’ জবাবটা দিল রবিন। ‘সচরাচর এ রকম অপরিচিত রাইডারদেরই স্পনসর করেন নাকি আপনি, স্যার?’

রবিনের প্রশ্ন শুনে হাসল ডেনভার। ‘না, তা করি না। তবে বিলকে দেখে মনে হলো, পারবে, তাই স্পনসর করলাম। কেন, এ প্রশ্ন কেন?’

‘রবিন আসলে বলতে চাইছে বিলের বয়েস কম,’ কিশোর বলল। ‘আরও অভিজ্ঞ কাউকেই সাধারণত স্পনসর করা হয় তো।’

‘আমার বয়েস কম কে বলল?’ রেগে গেল বিল। ‘আঠারো! কম হলো? এরচেয়ে কম বয়েসীদেরও স্পনসর করা হয়। যোগ্যতাটাই আসল কথা।’

কিশোর-রবিন দুজনের কাঁধেই কঠিন হাতের চাপ লাগল হঠাৎ। ওরা দেখল মরিস মরিসন দুই হাতে ওদের কাঁধ ধরেছেন। ‘তোমাদের তো এখন ফিশিং ক্যাম্পে বিছানায় থাকার কথা।’

‘হ্যাল্লো, মিস্টার মরিসন।’ বলে রবিনের দিকে তাকাল কিশোর। ‘রবিন, এঁর কথাই তোমাকে বলেছিলাম, কুমিরশিকারি। মিস্টার মরিসন, ও আমার বন্ধু, রবিন।’ মুসার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে মুখ ফেরাল ও। কিন্তু কাছাকাছি নেই মুসা। বেশ কিছুটা দূরে আগুনের একেবারে কাছ ঘেঁষে বসেছে, কাবাব ঝলসানো হচ্ছে যেখানে।

মরিসনের সঙ্গে হাত মেলাল রবিন। চট করে তাকাল একবার কিশোরের দিকে। ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিল, সকালবেলা সোয়াম্পল্যান্ড গুডস জেনারেল স্টোরে এই লোকটার সঙ্গেই কথা হয়েছিল। ‘আমি তো ভাবলাম,’ রবিন বলল, ‘কি-ওয়েস্টে চলে গেছেন আপনি।’




Leave a Reply

Your email address will not be published.